নারীর ক্ষমতা ও সমতাঃ নারীবান্ধব রবীন্দ্রবলয়ে স্ববিরোধিতা

নারীর ক্ষমতা ও সমতাঃ নারীবান্ধব রবীন্দ্রবলয়ে স্ববিরোধিতা

"Until conditions of equality exist, no one can possibly assess the natural differences between women and men, distorted as they have been. What is natural to the two sexes can only be found out by allowing both to develop and use their faculties freely."

                —John Stuart Mill

 

ধর্ম ও ধর্মীয় বিধান, আর পুরুষ ও পুরুষতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট, কুসংস্কার, নিরক্ষরতা ও অশিক্ষার ভারে নত, বহু সন্তানের জননী, বছরের পর বছর অর্ধাহারে—পরিশ্রমে অপুষ্টিতে ও প্রগাঢ় ভগ্ন-স্বাস্থ্যের অধিকারী ভারত উপমহাদেশের নারীর যে করুণ অবস্থা ছিল ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত, তার থেকে প্রথম মুক্তির আলোর যে সন্ধান পায় মেয়েরা, পায় বেঁচে থাকার নূন্যতম অধিকার অর্জনের সুযোগ, তার পেছনে ছিলেন প্রথমত ও প্রধানত বাংলার দুই নারীবান্ধব মহাপুরুষ, দুই নারীবাদী সমাজ সংস্কারক, রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর।

তাঁরাই প্রথম উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করেছিলেন, সর্বপ্রথম সোচ্চার হয়েছিলেন আমূল সংস্কারের মধ্য দিয়ে সমাজ-সংসারে মেয়েদের এই চরম দুরবস্থা, হীন অবস্থার পরিবর্তন করতে। শাসনের সিংহাসনে ইংরেজদের উপস্থিতি তাঁদের এই কঠিন প্রচেষ্টাকে সার্থক ও জয়ী হতে সাহায্য করেছে। সেইসঙ্গে কুসংস্কার, কুনীতি ও বিভিন্ন নারী-বিদ্বেষী রীতির বিরোধিতাকারী পশ্চিমী শিক্ষায় শিক্ষিত প্রগতিশীল তরুণদের নিয়ে গঠিত সমাজ সংস্কারের ধর্ম, ব্রাহ্ম ধর্মের উত্থান, ডিরোজারিও কর্তৃক প্রবর্তিত ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্টের কুসংস্কার দূরীকরণ ও ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন ও কিছু পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মূল্যবোধের আমদানি সমাজে নারীর অবস্থার পরিবর্তনে কিছুটা সুফল বয়ে এনেছিল। স্বদেশী আন্দোলন এবং দেশকে স্বাধীন করার বিপ্লবী ও অহিংস সংগ্রামের জোয়ারে নারীর অন্তর্ভুক্তি নারী আন্দোলসকে আরও প্রাণবন্ত ও গতিশীল করেছিল। চৌকাঠ পেরিয়ে নারী তখন বাইরে বেরিয়ে এসে নিজের জন্যে এক উন্মুক্ত পৃথিবী আবিষ্কার করে ফেলে। ঘর ছাড়াও বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে নারী এক ধরনের সম্পৃক্ততা বোধ করে।

সময়ের বিচার করলে দেখা যাবে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধাংশে এই উপমহাদেশকে আলোকিত করে একসঙ্গে আবির্ভূত হয়েছিলেন অনেকগুলো ক্ষণজন্মা মানুষ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। বাংলার সে রেনেসাঁসের যুগে প্রতিটি ক্ষেত্রে, হোক সে রাজনৈতিক অঙ্গন, অথবা সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজসেবা, সমাজ সংস্কার, নারী প্রগতি কিংবা স্ত্রী স্বাধীনতা, সকল রকম উন্নয়নমূলক কাজে এতগুলো সাহসী, প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন ও মৌলিক চিন্তার অধিকারী মানুষ একত্রিত হয়েছিলেন যে মাত্র এক শ’ বছরে (আনুমানিক ১৮৩০-১৯৩০) এই ভূখ-কে তারা মিলিতভাবে যতখানি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তা আর অন্য কোনো শতাব্দীতে ঘটেছে বলে মনে হয় না। ফলে দেখা যায়, এই সময় শিক্ষায়, পেশায়, দেশোদ্ধারে, আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যে অভূতপূর্ব স্রোতঃশীলা হয়েছিল নারী আন্দোলন, তার পেছনে ওই সময়ের বাংলায় কিছু নারীবান্ধব আইনের সংযোজন ও সমাজনীতির সংস্কারের ঘটনা, এবং বাংলার তথা উপমহাদেশের মহাকাশে কিছু বিরল ব্যক্তিত্বের আবির্ভাবের ঘটনা ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এইসব যুগান্তকারী পশ্চিমী চিন্তাচেতনার সঙ্গে পরিচিত ও আধুনিকমনস্ক এক ঝাঁক প্রগতিবাদী পুরুষের আগমন শুধু সরাসরি স্বাধীনতার আন্দোলনে নয়, বৈপ্লবিক সমাজ সংস্কারেই নয়, নারী শিক্ষা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা বিকাশেও যথেষ্ট সহায়ক শক্তি ও সহযোগী আন্দোলনকারীর ভূমিকা পালন করে।

এই প্রসঙ্গে এটি বলে রাখা যুক্তিসংগত যে নারীশিক্ষা বা নারীর সীমিত চলাফেরা কিংবা আর্থিক স্বাবলম্বিতায় কোন ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করা যে সকল পুরুষ নারীর সকল রকমের অধিকার বা সার্বিক স্বাধীনতা মেনে নিয়েছিলেন বা তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সকল স্তরেই অর্থাৎ নারীশিক্ষা, স্বাধীনতা, স্বাবলম্বিতা বা আত্মোউপলব্ধির সকল বিষয়ে, সকল পর্যায়েই যে সমান আগ্রহী বা সমর্থক ছিলেন তা নয়। কেউ হয়তো নারী প্রগতির একটি বিশেষ ক্ষেত্রে অতি আগ্রহী ছিলেন, অন্যত্র আবার প্রকাশ্যেই ছিলেন বিরোধী। যেমন রাধাকান্ত দেব যিনি ছিলেন একজন অতি রক্ষণশীল হিন্দু সমাজনেতা এবং সতীদাহের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানকারী কট্টর প্রাচীনপন্থী, অন্যদিকে তিনি কিন্তু ছিলেন আবার নারীশিক্ষা এবং জ্ঞানার্জনে পুরুষ-নারীর সমান অধিকার ও অংশগ্রহণের ঘোর সমর্থক। নারী শিক্ষার প্রসারের জন্যে সহজ করে পুস্তক রচনা থেকে স্কুলনির্মাণ সবই করেছেন তিনি। ফলে দেখা যায় সব মানুষ সর্বক্ষেত্রে সব সময় এক-ই রকম ব্যবহার করতে পারেন না। কোনো কোনো সময় কোনো বৃহৎ আন্দোলনের কোনো বিশেষ দিক বা অংশের সঙ্গেই কেবল অন্য আন্দোলনের মিল থাকে; বাকিটার সঙ্গে থাকে না। সেক্ষেত্রে সার্বিকভাবে সেই আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারেন না কেউ কেউ। আবার কারও কাজের সঙ্গে কথার মিল নেই। কারও ব্যক্তিগত জীবনযাপনে তার বক্তৃতা বা লেখার আদর্শ প্রতিফলিত হয় না। যেমন কালীপ্রসন্ন ঘোষ সমাজের অর্ধেককে মানে মেয়েদের অন্ধকারে অর্থাৎ অশিক্ষায় ফেলে রেখে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় এই উপলব্ধিতে নারীশিক্ষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন এবং নারীদের জন্যে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। আবার তিনি-ই প্রচার করেন মেয়েদের বুদ্ধিশুদ্ধি কম, তারা ধর্ম মনোভাবাপন্ন এবং কোমল স্বভাবের, ফলে তাদের বিজ্ঞান বা বাণিজ্যের বদলে ধর্ম শিক্ষা ও কবিতা পড়ানো উত্তম। স্ববিরোধিতার বিবরণ দিতে গেলে তা এতটাই বিস্তৃত হবে যে আর অন্য প্রসঙ্গে কিছু বলার সুযোগ থাকবে না। নারীমুক্তির জনক বিদ্যাসাগর পর্যন্ত মঞ্চে ভদ্রলোকের ছেলেদের পাশে রক্ষিতা, বারবনিতা, বাইজিদের অভিনয় ও গানবাজনা করার চরম বিপক্ষে অবস্থান নেন। এতে ভদ্রঘরের যুবকেরা উচ্ছন্নে যাবে বলে শঙ্কিত ছিলেন তিনি। সেই সময় ভদ্রঘরের মেয়েরা প্রকাশ্য নাট্যমঞ্চে উঠে কিংবা চলচ্চিত্রে পুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতেন না। একেবারে প্রাথমিক স্তরে পুরুষেরাই নারী সেজে অভিনয় করতেন। পরে বিশেষ করে পশ্চিমী মনোভাবাপন্ন মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’ করার সময় নারীর ভূমিকা নারীদের দিয়েই সম্পন্ন করার জন্যে যখন জেদ ধরলেন, ফলে বেঙ্গল থিয়েটার্স তাদের নিয়ম খানিকটা শিথিল করে, তখন মেধাবী বারবনিতা, ও বাইজিরা প্রথমে এসে সেই স্থান দখল করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যিনি বাঙালি হিন্দু বিধবাদের পুনরায় বিবাহ চালু করেছিলেন, বাল্যবিবাহ রোধ করেছিলেন, তিনি এই ব্যাপারে এতটাই রক্ষণশীল ছিলেন যে এইসব বাজারের মেয়েদের সঙ্গে ভদ্র পরিবারের ছেলেদের একত্রে অভিনয়ের ব্যবস্থায় ভদ্র পরিবারের ছেলেরা উচ্ছন্নে যাবে এই আশঙ্কায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বেঙ্গল থিয়েটার্স ছেড়ে বেরিয়ে যান। অথচ গণিকা, বাইজিদের এই আগমন কুল নারীদের জন্যে মঞ্চ কিংবা ছায়াছবিতে অভিনয়, নৃত্য ও গীতে অংশগ্রহণ করার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়।

এইসব কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্ববিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও যে সকল পুরুষ নারীর প্রগতি বা কল্যাণের জন্য কোনো না কোনো ক্ষেত্রে বা কোনো এক বিষয়ে বিশেষ তৎপর হয়েছিলেন, তাঁদের সকলের ইতিবাচক ভূমিকাকেই আমরা স্বীকার করার চেষ্টা করি। সামগ্রিকভাবে এবং সর্বক্ষেত্রে তা ইতিবাচক না হলেও। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এই ব্যাপারে ব্যতিক্রম নন। সর্ব দিক বিবেচনায় শতভাগ নারীবান্ধব বা নারীর সমতায় বিশ্বাসী পুরুষের সন্ধান যেহেতু অতি বিরল, অন্তত নারীশিক্ষা, প্রগতি বা আত্মপ্রতিষ্ঠার কোনো বিশেষ দিকে স্ত্রী-পুরুষে সমতার মনোভাব দেখলেই তাকে নারীবান্ধব আখ্যায়িত করতে রাজি আমরা। সেই বিচারে সাহিত্য-সংস্কৃতি-নান্দনিকতায়, বন্ধুত্বে, গল্প-গুজব-আড্ডায় সমসাথী ও সহযোগী হিসেবে নারীকে স্থান দিয়ে সংসারে মৌলিক মানবাধিকার অর্জনে নারীর সক্ষমতায় বিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমরা সেইসময় কালের একজন নারীবান্ধব পুরুষ হিসেবে জানি। যদিও নারীর বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভা, উদ্ভাবন ক্ষমতায় তাঁর যথেষ্ট সংশয় ও বৈষম্যবোধ ছিল। ছিল ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ভূমিকায় কি সাহিত্য ক্ষেত্রেও স্ববিরোধী মনোভাব ও আচরণ।

সাহসী সমাজ সংস্কারক ও অগ্রগামী চিন্তাচেতনার মহাপুরুষ রামমোহন রায় পর্যন্ত সতীদাহ থেকে মেয়েদের রক্ষা করেছেন ঠিক, কিন্তু বিধবা বিবাহের পক্ষে কোনো আন্দোলন গড়ে তোলেন নি। তারপরেও বিধবাদের বেঁচে থাকার অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে নারীর সীমিত কিছু দাবি দাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও তাকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারীবান্ধব বলতে দ্বিধা করি নি আমরা। একইরকমভাবে বিধবা বিবাহ প্রবর্তন করে নারীর স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন দানে যে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন বিদ্যাসাগর, তাতে মঞ্চ-থিয়েটারের শুরুতে যখন নারী চরিত্রে অভিনয় করতে ভদ্রঘরের মেয়েরা তখনো এগিয়ে আসেন নি এবং কেবল বারবনিতারাই অংশ নিতেন, তখন বিদ্যাসাগর এই দ্বিচারিণীদের সঙ্গে এক-ই মঞ্চে অভিনয় করলে ভদ্রলোকের ছেলেরা নষ্ট হয়ে যাবে এই যুক্তিতে অটল থেকে এবং অসন্তুষ্ট হয়ে বেঙ্গল থিয়েটার থেকে বেরিয়ে যান।

ফলে স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, কিছু স্ববিরোধিতা থাকলেও এইসব অগ্রগামী পথপ্রদর্শক, যুগান্তকারী চিন্তাবিদ ও নারীবান্ধব সৃজনশীল পুরুষের আবির্ভাবে বাংলার নারীআন্দোলন যথেষ্ট বেগবান হয়ে উঠেছিল।

আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির নির্মাতা রবি ঠাকুরের সাহিত্যককর্মে এবং যাপিত জীবনের বিভিন্ন কাজকর্মের অনুষঙ্গে নারীবিষয়ক ব্যাপারগুলোতে যেমন নারী স্বাধীনতা, নারী প্রগতি, নারীর অবদান ইত্যাকার বিষয়ে প্রচুর স্ববিরোধিতা লক্ষ করা যায়। রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্ববরেণ্য লেখক যিনি পরম মমতায় ও সহানুভূতির সঙ্গে তাঁর ছোটগল্পের নারী চরিত্র নির্মাণ করে ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘হৈমন্তী’, ‘জীবিত ও মৃত’, ‘নষ্টনীড়’, ‘মধ্যবর্তিনী’, ‘কঙ্কাল, ‘লেবরেটরি’, ‘খাতা’র মতো গল্প লিখেছেন, ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘শ্যামা’ র মতো কাব্যে , দৃঢ়চেতা, স্বাধীন, সাহসী আত্মসচেতন নারী চরিত্র রচনা করে গেছেন। শ্যামা ও চিত্রাঙ্গদা চরিত্র তিনি পুনর্নিমাণ করেছেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলো ছোটগল্পের চরিত্রের মতো তেমন তেজস্বিনী ও প্রতিবাদী সবসময় না হলেও প্রায়শ ই আত্মসচেতন। বিপ্লবী বা যুগান্তকারী না হলেও তার অবিস্মরণীয় সৃষ্টি কুমু, বিমলা, বিনোদিনী। শেষের কবিতার নায়িকা লাবণ্য জড়তাহীন, আধুনিক, স্মার্ট ও রোমান্টিক।

কিন্তু আধুনিক সেই রবীন্দ্রনাথ-ই আবার ‘মানসী’ কবিতায় চিরন্তন, শাশ্বতী ও কল্যণীরূপী নারীকে খুঁজে পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছেন:

শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী!

পুরুষ গড়েছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারি

আপন অন্তর হতে।...

অর্ধেক মানবী তুমি, অর্ধেক কল্পনা।

এই কবিতায় পুরুষ নারীর আরেক বিধাতা। একজন পরিচিত পুরুষতান্ত্রিক মানুষের মতো তিনি নারীর মধ্যে দেখেছেন শুধু রূপ আর আবেগ। তিনি বলেছেন নারীর শক্তিহীনতা, প্রতিভার ঘাটতি, এসবই প্রাকৃতিক। বলেছেন ‘মেয়েরা সকল বিষয়েই যদি পুরুষের সমকক্ষ, তাহলে পুরুষের প্রতি বিধাতার নিতান্ত অন্যায় অবিচার বলতে হয়।’ তার চোখে নারী-পুরুষের অসাম্যই ন্যায় সংগত। সমতা-ই অন্যায় ও প্রকৃতি বিরুদ্ধ। তিনি নারী-পুরুষকে প্রাকৃতিকভাবেই দুই বিপরীত ও পরিপূরক সদস্য বলে মনে করেন:

‘আমরা যেমন বলে শ্রেষ্ঠ, মেয়েরা তেমনই রূপে শ্রেষ্ঠ; অন্তঃকরণের বিষয়ে আমরা যেমন বুদ্ধিতে শ্রেষ্ঠ, মেয়েরা তেমনই হৃদয়েসংগত; তাই স্ত্রী-পুরুষ দুই জাতি পরস্পর পরস্পরকে অবলম্বন করতে পারছে। স্ত্রীলোকের বুদ্ধি পুরুষের চেয়ে অপেক্ষাকৃত অল্প বলে স্ত্রীশিক্ষা অত্যাবশ্যক এটা প্রমাণ করবার সময় স্ত্রীলোকের বুদ্ধি পুরুষের ঠিক সমান এ কথা গায়ের জোরে তোলবার কোনো দরকার নেই।’

রবীন্দ্রনাথ রমা বাঈ-এর বক্তৃতা বা কৃষ্ণভাবিনীর নারীবাদী লেখার তীব্র প্রতিবাদ জানান কাগজে সরাসরি বিরোধিতা ও কটুক্তি করে। মহারাষ্ট্রের নারী আন্দেলনের নেত্রী পণ্ডিত রমাবাঈ-এর একটি বক্তৃতা সভায় রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে পুরুষদের বিরোধিতায় বক্তৃতা অসম্পূর্ণ থাকে অনুষ্ঠান ভণ্ডুল হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখার শেষে এই সভা ভণ্ডুলের তথ্য উল্লেখ করেন। কিন্তু রমাবাঈ-এর বক্তৃতা সম্বন্ধে তিনি রক্ষণশীল মনোভাবের পরিচয় দিয়ে লিখেছিলেন, ‘সন্তানকে উপলক্ষ করে ঘরের মধ্যে থেকে পরিবার-সেবা মেয়েদের স্বাভাবিক হয়ে পড়ে, এ পুরুষদের অত্যাচার নয়, প্রকৃতির বিধান’ (রমাবাঈ-এর বক্তৃতা উপলক্ষে পত্র ‘ভারতী ও বালক’—আষাঢ় ১২৯৬)। সাধনা সাহিত্য-প্রত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল কৃষ্ণভাবিনী দাসের লেখা দুটি প্রবন্ধ—‘শিক্ষিতা নারী’ (আশ্বিন ১২৯৮) এবং ‘অশিক্ষিতা ও দরিদ্রা নারী।’ ‘সাধনা’য় সাহিত্য সমালোচনায় কৃষ্ণভাবিনীর প্রবন্ধকে আক্রমণ করেন রবীন্দ্রনাথ। ‘শিক্ষিতা নারী’র এই সমালোচনার প্রতিবাদ করেন কৃষ্ণভাবিনী। প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘নারীর আদর কালক্রমে আপনি বাড়িবে, সেজন্য নারীদিগকে কোমর বাঁধিতে হইবে না, বরঞ্চ আরও অধিক সুন্দর হইতে হইবে।’ রবীন্দ্রনাথ নারীর শ্রী, কল্যাণীরূপ ও সেবাদাক্ষিণ্যে বিনম্র চিরন্তন নারী যে স্বার্থহীনভাবে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে আনন্দিত, তেমন নারীকেই তার কল্পনার আদর্শ নারী হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। পশ্চিমী নারী আন্দোলনকে ‘ কোলাহল’ বলে আখ্যায়িত করেন তিনি। তাঁর ‘পশ্চিম যাত্রীর ডায়রি’তে তিনি সরাসরি মেয়েদের উদ্ভাবন ক্ষমতার ঘাটতি আছে বলে মন্তব্য করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সভ্যতা সৃষ্টির পেছনে নারীর ভূমিকাকে প্রায় অস্বীকার করেন। তিনি বলেন: ‘সাহিত্য কলায় বিজ্ঞানে দর্শনে ধর্মে বিধি ব্যবস্থায় মিলিয়ে আমরা যাকে সভ্যতা বলি সে হলো প্রাণ প্রকৃতির পলাতক ছেলে পুরুষের সৃষ্টি’। রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘ইয়ুরোপের সভ্যতা যত অগ্রসর হচ্ছে স্ত্রীলোক ততই অসুখী হচ্ছে’। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, মেয়েদের হতে হবে নারী; কল্যাণী। আর পুরুষ হবে কবি, শিল্পী, বিজ্ঞানী, শাসক, গণিতজ্ঞ, প্রকৃতি অর্থাৎ স্রষ্টা বা প্রভু। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘প্রকৃতির একটা বিশেষ অভিপ্রায় নারীর মধ্যে চরম পরিণতি পেয়েছে। সে জীবধাত্রী, জীবদায়িনী।...প্রাণসৃষ্টি, প্রাণপালন, ও প্রাণতোষণের ঐশ্বর্য তার দেহে মনে পর্যাপ্ত। পুরুষের আছে বীর্য আর মেয়েদের আছে মাধুর্য। মেয়েদের সৃষ্টির আলো যেমন এই প্রেম, পুরুষের সৃষ্টির আলো কল্পনাবৃত্তি।’

 কিন্তু সেই এক-ই রবীন্দ্রনাথ পারিবারিক নাট্যমঞ্চে পরিবারের অন্যান্য নারী সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে নিজে এবং পরিবারের অন্যকিছু পুরুষ সদস্যসহ নিয়মিত গীতিনাট্যে ও নিত্যনাট্যে অংশগ্রহণ করতেন।

দুর্গামোহন দাশের জ্যেষ্ঠা কন্যা সরলা দাশের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের বড়বোন স্বর্ণকুমারীর গঠিত মেয়েদের সংগঠন সখি সমিতির জন্যে অর্থসংগ্রহের উদ্দেশে ‘মায়ার খেলা’ গীতিনাট্যটি লিখে দেন যা মঞ্চায়িত করে তহবিল সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া সেই সময় থেকেই তার ও তার মেজদা সত্যেন্দ্রনাথের উৎসাহে নারী-পুরুষের মধ্যে খোলামেলা নির্মল বন্ধুত্বের সূচনা হয়। এর আগে অনাত্মীয় নারী-পুরুষের মধ্যে রোমান্টিক সম্পর্ক ছাড়াও যে স্রেফ বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে এ ধারণা বা বিশ্বাস প্রচলিত ছিল না। ছিল না অনাত্মীয় পুরুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ-অন্তঃপুরবাসিনী নারীর। রবীন্দ্রনাথ পুরুষ নারীসহ গঠিত তাঁর সাহিত্যসভা ‘ডাকাতের দল’, ‘খামখেয়ালী সভা,’ কিংবা শাহজাদপুরের পদ্মার বুকে নৌবিহারের মধ্য দিয়ে সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি সম্পর্কিত দীর্ঘ আলোচনা, স্বরচিত লেখা পাঠ ও সংগীত পরিবেশন করে এবং করিয়ে প্রমাণ করেছেন নারী-পুরুষে সুস্থ বন্ধুত্ব সম্ভব। এইসব আডডা-আলোচনা স্থলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তখনকার দিনের সকল বিখ্যাত সাহিত্য ও সংস্কৃতিমোদীরা হাজির হতেন।

সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে নারীকে সহযাত্রী হিসেবে গ্রহণ করলেও নারীর শাশ্বত ও কল্যাণময়ী রূপকে, নারীর সৌন্দর্য ও সেবাদানকারী ভূমিকাকে খুব বড় করে দেখতেন রবীন্দ্রনাথ। সেটাই প্রকৃতিগতভাবে নারীর প্রকৃত রূপ অর্থাৎ সহজাত বলে তিনি মনে করতেন। তাই নারীর কেবল এই রূপটকেই গ্রহণ করেছিলেন তিনি। পশ্চিমের নারী মুক্তি আন্দোলনকে কোলাহলের সঙ্গে শুধু তুলনাই করেন নি, তিনি তাকে প্রাকৃতিক সামঞ্জস্য ভঙ্গকারী কর্মকা- বলে অভিহিত করেছেন। আর সেটা করেছেন ১৯২৪ সালে।

কিন্তু ১৯৩৬ সালে, ঠিক এক যুগ পরে, নিখিল বঙ্গ মহিলা-কর্মী সম্মিলনে আমন্ত্রিত হয়ে যে প্রবন্ধ পাঠ করলেন রবীন্দ্রনাথ, সেখানে তিনি তাঁর নতুন নারী-ভাবনা উন্মোচিত করলেন। তার তখনকার অবস্থান এক যুগ আগের থেকে যোজন যোজন দূরে। এই প্রবন্ধে তিনি সভ্যতায় নারী-পুরুষের ভূমিকার নতুন রূপরেখা আঁকেন। তিনি বলেন, ‘সভ্যতা সৃষ্টির নতুন কল্প আশা করা যাক। এ আশা যদি রূপ ধারণ করে তবে এবারকার এ সৃষ্টিতে মেয়েদের কাজ পূর্ণ পরিমাণে নিযুক্ত হবে সন্দেহ নেই। নবযুগের এই আহ্বান যদি আমাদের মেয়েদের মনে পৌঁছে থাকে তবে তাদের রক্ষণশীল মন যেন বহু যুগের অস্বাস্থ্যকর আবর্জনাকে একান্ত আসক্তির সঙ্গে বুকে চেপে না ধরেন। তারা যেন মুক্ত করেন হৃদয়কে, উজ্জ্বল করেন বুদ্ধিকে, নিষ্ঠা প্রয়োগ করেন জ্ঞানের তপস্যায়। সামনে আসছে নতুন সৃষ্টির যুগ।’ রবীন্দ্রনাথ সেই মহামিলনে নারীদের যোগদান করতে আহ্বান জানান।

 রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবদ্দশায় বারবার নিজেকে নিজে অতিক্রম করেছেন। তাই আমরা অবাক হই না যখন দেখি বারো বছর আগে নারীর প্রথাগত ভূমিকাকে সুস্থ, স্বাভাবিক ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বললেও বারো বছর পরে সভ্যতা গড়তে নারীকে আহ্বান করেছেন বাইরে এসে পুরুষের পাশে দাঁড়াতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই বাড়তি উদারতা যদি কেবল সেদিনের অনুষ্ঠানের আয়োজকদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের পীড়িত না করার জন্যেই বলা না হয়ে থাকে, তাঁর নারী ভাবনার যদি এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন সত্যি ঘটে থাকে তাহলে আমরা আশাবাদী হয়ে উঠতে পারি। নারীর প্রতি রবীন্দ্রনাথের এমন প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের প্রীত করে। কিন্তু তারপরেও আমরা কিছুটা নিরাশ হই যখন দেখি, এই শেষোক্ত আহ্বানেও নারীদের ভীরুতা, রক্ষণশীলতা, পশ্চাৎপদতা ও দ্বিধার জন্যে তিনি নারীদেরই দায়ী করেছেন। পুরুষতন্ত্র ও দীর্ঘকাল ধরে নারীর সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াই যে এজন্য দায়ী এটা যেন তখনো স্বীকার করছেন না রবীন্দ্রনাথ।

মহাভারতের উপাখ্যানকে চিত্রাঙ্গদার মতোই নবায়ন বা পুনর্লিখন করেছেন রবীন্দ্রনাথ যেমন কচ ও দেবযানীর উপাখ্যান ‘বিদায় অভিশাপ’-এ। কিন্তু চিত্রাঙ্গদার মতো অকুতোভয়ে ‘নহি মাতা, নহি বধূ’ কিংবা ‘সে নহি নহি’ বলে স্বাধীনচেতা, সাহসী ও অদ্বিতীয় হতে পারে নি দেবযানী। কচের আসন্ন বিদায় মুহূর্তে চিরন্তন নারীর মতো দেবযানী মুষড়ে পড়ে। তাকে বিবাহ না করে শিক্ষা শেষে গুরুগৃহ থেকে কচ চলে যাচ্ছে। রাগে, দুঃখে, অপমানে, অভিমানী দেবযানী তাকে অভিশাপ দিচ্ছে এই বলে যে তার পিতার কাছে থেকে শেখা মৃতসঞ্জীবনী শিক্ষা নিয়ে ঘরে ফিরলেও বাস্তবে কচ কোনোদিন মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম হবে না। মহাভারতে আছে, উত্তরে কচও দেবযানীকে অভিশাপ দেয় যত সুন্দরী আর গুণবতীই হোক না কেন দেবযানী, কোনো ব্রাহ্মণপুত্রের সঙ্গে দেবযানীর বিয়ে হবে না। ক্ষত্রিয় সন্তানের সঙ্গে হবে তার বিয়ে। সত্যি সত্যি-ই পরে ক্ষত্রিয় যযাতির সঙ্গেই দেবযানীর বিয়ে হয়। কিন্তু রবীন্দ্র রচনায় পরিত্যক্তা ও ক্ষুব্ধ নারী দেবযানী ক্রোধে, বঞ্চনায়, অপমানে কচকে অভিশাপ দিলেও পুরুষ কচ মহামানবের মতো দেবযানীকে অভিশাপ না দিয়ে তাকে সুখী হওয়ার জন্যে আশীর্বাদ করে পৌরুষের জয়গান গেয়েছেন। পরাজিত নারী দেবযানীর ক্ষুদ্রত্বকে বিস্তৃতভাবে প্রকাশ করে পুরুষ কচকে উদার ও মহৎ করে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ।

মহাভারতের আরেক উপাখ্যান নিয়ে রচিত রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘কর্ণ ও কুন্তি সংবাদ’-এ কর্ণকে যেমন আদর্শ ও উচ্চ মানবিক গুণসম্পন্ন দেখিয়েছেন। মাতা কুন্তীকে তেমনি মমতাময়ী মায়ের বদলে কৌশলী ও রাজনৈতিক নারী হিসেবেই চিত্রায়ণ করেছেন। আজন্ম পরিত্যক্ত জ্যেষ্ঠ সন্তান কর্ণের কাছে তার যুদ্ধক্ষেত্রে যাবার পূর্বমুহূর্তে মাতার দাবি নিয়ে এসে অন্যভ্রাতা পা-বদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে বারণ করেন কুন্তী। এর বিনিময়ে তাকে লোভনীয় রাজসিংহাসন দানের সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন। কিতু বিনাযুদ্ধে স্বাভাবিক অবস্থায় কুন্তী কোনোদিন জন্মে পরিত্যক্ত তাঁর প্রথম সন্তানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেন নি। উপমহাদেশীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তাঁর জননীরূপকে পদদলিত করে কুন্তী তার রাজনৈতিক সত্তার-ই জয়গান করেছে, যা তাকে উচ্চাসনে রাখে নি। তা করবার কোনো চেষ্টাও করেন নি রবীন্দনাথ। কুন্তী, রবীন্দ্রনাথের মূল্যবোধে, তার প্রাকৃতিক সত্তাকে, সহজাত গুণকে জলাঞ্জলি দিয়েছে এখানে যা জগৎ-জীবনের মাধুর্য নষ্ট করে। চিত্রাঙ্গদা, কচ চরিত্রকে যেমন পুনর্নিমাণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ, তেমনি কুন্তীকেও পুরোপুরি রাজনৈতিক ও কৌশলী না করে জীবনের এমন এক মহাসংকটময় সময়ে এসে তাঁকে কিছুটা মমতাময়ী, মানবিক ও স্নেহময়ী জননী রূপে উপস্থাপিত করতে পারতেন। কেননা ঐতিহ্যকে পুনর্নিমাণ করার অধিকার কবির আছে। কবি নিজেই বলেছেন, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি. রামের জনম স্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।’

শুধু সাহিত্যে নয়, ব্যক্তিগত জীবনে নিজ কন্যাদের পড়াশোনা করতে প্রতিষ্ঠানিক উচ্চ বিদ্যালয়ে না পাঠিয়ে বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা করেন রবি ঠাকুর। তাও যৌতুকসহ। অথচ ঠাকুর বাড়ির অন্য মেয়েরা যেমন, তার ভাগ্নী সরলা দেবী চোধুরানী ও ভাইঝি ইন্দিরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। দেখা গেছে, ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের মধ্যে পরবর্তী প্রজন্মের এই দুজন পরিশীলিত, শিক্ষিত নারীর সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথের বৌদ্ধিক চিন্তা চেতনার আদান-প্রদান হতো সবচেয়ে বেশি। এমনকি কনিষ্ঠা কন্যা মীরা দেবী যিনি তঁর অন্য ভাইবোনদের তুলনায় যথেষ্ট আয়ু পেয়েছিলেন, তাঁর স্মৃতিকথা যেভাবে তিনি লিখে রেখে যান তা পড়ে এবং সেই বইয়ের ভেতর তাঁর হাতের লেখার নমুনা দেখে বোঝা যায় মেয়েদের বুদ্ধিবৃত্তির উন্নতি সাধনে রবীন্দ্রনাথ তেমন যতœবান ছিলেন না। কন্যাদের বাল্য বিবাহ দিলেও পুত্র রথীন্দ্রনাথকে ঠিক-ই আমেরিকায় পাঠান রবীন্দ্রনাথ উচ্চতর কৃষিবিদ্যাসহ বাস্তবসম্মত পড়ালেখা শিখে আসার জন্যে শ্রীনিকেতন গড়ে তোলার জন্যে। রথীন্দ্রনাথ ছাড়া মেয়ে জামাইকেও পাঠান। কিন্তু কোনো কন্যাকে নয়। কন্যাদের বাল্য বিবাহে আপত্তি না থাকলেও পুত্রের উচ্চশিক্ষার অন্তরায় হতে পারে বলে মৃত স্ত্রীর নির্বাচিতা ভাবী পুত্রবধূর সঙ্গে তখন রথীনের বিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান রবি ঠাকুর। পরে সেই এক-ই নির্বাচিতা পুত্রবধূ প্রতিমার সঙ্গেই রথীন্দ্রনাথের দেন তিনি। কিন্তু তা ঘটে প্রতিমার সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যে অন্যত্র বিবাহের পর সে বিধবা হয়ে যাওয়ার পর। বিদ্যাসাগর কর্তৃক প্রবর্তিত বিধবা বিবাহে পুত্রের বিবাহ আইনসংগত হলেও বিধবা বিবাহকে সর্বক্ষেত্রে মেনে নেওয়ার মানসিকতা অর্জন করতে পারেন নি রবীন্দ্রনাথ। হয়তো ব্রাহ্মসমাজের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, পথিকৃৎ ও সর্বোচ্চ নেতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের দুর্দান্ত প্রতাপ ও নিজে পিতাকে অনুসরণ করে আদি ব্রাহ্মসমাজের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্যেই সেটা সম্ভব হয় নি। আর তাই বুঝি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পাঁচ বছর পরে রবীন্দ্রনাথ নিজে বিধবা প্রতিমার সঙ্গে রথীন্দ্রনাথের বিয়ে দেন। এটাই ঠাকুরবাড়ির প্রথম বিধবা বিবাহ।

এর আগে পিতা মহর্ষির আদেশে রবীন্দ্রনাথ-ই মৃত জ্যেষ্ঠ ভাইয়ের বিধবা তরুণী পুত্রবধূ সাহানার সমূহ পুনঃবিবাহ বানচাল করে দিয়ে (যদিও ততদিনে বিধবা বিবাহ আইনসংগত হয়ে গেছে) তাকে তার পিতৃগৃহ থেকে পুনরায় ঠাকুর পরিবারে ফিরিয়ে আনেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে বৈধব্য যাপনের জন্যে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ এই কাজের জন্যে আগে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রদের এক এক করে সকলকেই অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু কেবল কনিষ্ঠ পুত্র পরশুরামের পিতৃআদেশে সাড়া দেওয়ার ও ভক্তি প্রদর্শনের মতোই একমাত্র বাড়ির ছোট ছেলে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া এই বেআইনি ও নিষ্ঠুর কাজে কেউ জড়াতে চান নি। দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কেউ রাজি হন নি পিতৃগৃহ থেকে যৌবন ছুঁইছুঁই বিধবা সাহানার আশু বিয়ে বানচাল করে দিয়ে তাকে ঠাকুর বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে। এর পরেও এই কচি বিধবা বউটির শাশুড়ি অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের স্বামীহীন বৌদির শত আগ্রহ বা অনুরোধ সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ সাহানাকে শান্তিনিকেতনের স্কুলে অঙ্ক বা বিজ্ঞানে পড়াশোনার সুযোগ দেন না। পরে বউটির শাশুড়ি নিজেই অগ্রণী হয়ে অন্যান্যদের সঙ্গে বিধবা পুত্রবধূকে বিদেশে পাঠিয়ে পড়াশোনা করান। তারপরে দেশে ফিরে এসেও সাহানা শান্তিনিকেতনে শিক্ষকতা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ তাকে সে সুযোগ দেন না, যদিও তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই স্কুল টির উন্নয়নে যেখানেই যোগ্য শিক্ষকের দেখা পেয়েছেন, তখন-ই তাকে শান্তিনিকেতনে যোগ দেওয়ার জন্যে অনুরোধ করেছেন। সাহানাকে দুই দুবার শান্তিনিকেতনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে বাধা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রকারান্তরে সাহানাকে জনসম্মুখে উপস্থাপনে অনীহা প্রদর্শন করেছেন।

শেষ বয়সে রবীন্দ্রনাথ যে নারীদের বাইরে বেরিয়ে এসে পুরুষের পাশাপাশি বিশাল কর্মযজ্ঞের হাল ধরতে আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেটা কি তাঁর অন্তরের কথা ছিল? নাকি ছিল শুধুই বক্তৃতা? নারীদের আমন্ত্রণে আসা নারী সংগঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে সভ্যতার অগ্রগতিতে নারীর অন্তর্ভুক্তির আহ্বান জানানো ছাড়া তাঁর কোনো বিকল্প ছিল কি? নাকি ইতিমধ্যে প্রকৃত-ই এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছিল তাঁর মধ্যে? বলা যায় না। বিশেষ করে শেষ বয়সে রবীন্দ্রনাথের মনকে যথেষ্ট চঞ্চল করে দেওয়া ল্যাটিন আমেরিকার আকর্ষণীয় নারীবাদী কবি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধান ও সঙ্গলাভ ও তাঁর আতিথ্য গ্রহণ তিনি ভিক্টোরিয়ার নারী অধিকার সম্পর্কিত ভাবনা ও সচেতনতার সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হয়েছিলেন।

তবে এটাও তো সত্য, প্রাণপ্রিয় পুত্র রথিনকে তো বিধবা প্রতিমার সঙ্গে নিজেই অবশেষে বিয়ে দেন তিনি। কারণ আমরা জানি না, তবে কিছু অনুমান করা যায়।

রাজা রামমোহন রায়ের প্রবর্তিত অনেক বিষয়ে কুসংস্কারমুক্ত প্রগতিশীল আধুনিক মননের ধর্ম ব্রাহ্মধর্ম। রামমোহনের মৃত্যুর পর ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচার ও প্রসারে সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরু দায়িত্ব এসে পড়ে যাঁর ওপর, তিনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের পিতা। দেবেন্দ্রনাথের ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’ উপাসনালয়ে নারী-পুরুষের একত্রে বসে উপাসনার বিরোধিতা করে, মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয়ে গিয়ে শিক্ষাগ্রহণ অনুমোদন করে না, এমনকি বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। আমরা জানি মহর্ষি প্রবর্তিত এই ‘আদি ব্রাম্মসমাজ’-এর তুলনায় নতুনতর দুই ব্রাহ্মসমাজ, ১) কেশবচন্দ্র প্রবর্তিত ‘নববিধান ও ২) তরুণ বিপ্লবী সমাজ সংস্কারক ব্রাহ্মদের নিয়ে গঠিত ‘সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ’ নারী শিক্ষা ও নারীর পর্দার ব্যাপারে অনেক বেশি প্রগতিশীল ও উদার ছিল। নারীর সমকক্ষতা ও স্বাধীনতার ব্যাপারে রক্ষণশীল মনোভাবের কারণেই আদি ব্রাহ্ম সমাজ থেকে প্রথমে দলবল নিয়ে বেরিয়ে যায় মহর্ষির এক সময়ের ডান হাত বলে পরিচিত। কেশব চন্দ্র সেন তার প্রবর্তিত নববিধান ব্রাহ্ম ধর্ম নিয়ে। আবার সেখান থেকে আরেক ভাগে ভাগ হয় ব্রাহ্ম ধর্ম। ‘সাধারণ ব্রাহ্ম ধর্ম’ নামে এই ব্রাহ্ম শাখায় আসেন যারা বৈপ্লবিক সংস্কার ও নারীর সমকক্ষতার সপক্ষে ও নারী-পুরুষে অভিন্ন শিক্ষাসূচির পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। কেশব চন্দ্রের নববিধান নারীর জন্যে নারীসুলভ পাঠ্যক্রমের স্বপক্ষে মতপ্রকাশ করে। নারীর ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের কিছু কিছু প্রথাগত ও রক্ষণশীল মনোভাবের জন্যে তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত আদি ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের দায়িত্ব গ্রহণের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ও নিবিড় যোগাযোগের কথা অনেকেই উল্লেখ করেন। এ ছাড়া আর যে দুটি বিষয় রবীন্দ্রনাথকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঠিক নারীবান্ধব করে গড়ে উঠতে সাহায্য করে নি তার ১) একটি রবীন্দ্রনাথের জীবনে পিতা মহর্ষির অপরিসীম ও দুর্দান্ত প্রভাব। মেয়েদের ব্যাপারে রক্ষণশীল মহর্ষির পৌরুষতান্ত্রিক মনোভাব রবীন্দ্রনাথকে কোনো কোনো বিষয়ে নারীর স্বার্থরক্ষাকারীর ভূমিকায় দাঁড় করায় নি। ২) আর দ্বিতীয় যে অভিজ্ঞতার কারণে নারীর বৃহত্তর সামাজিক ভূমিকা গ্রহণে সর্বদা রবীন্দ্রনাথের পূর্ণ সাড়া বা সমর্থন মেলে নি, তা হতে পারে, তাঁর অতি অল্পবয়সেই পূর্ববঙ্গের শ্রেণিবিভক্ত সমাজে জমিদারি তদারকি করার দায়িত্ব গ্রহণ।

Leave a Reply

Your identity will not be published.