তুমি ভালো থেকো দাদাই

তুমি ভালো থেকো দাদাই

[সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছোটবোন সৈয়দা জাহিদা সাত্তার। তাঁর লেখাটি এখানে প্রকাশিত হলো, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে—বি.স.।]
লেখাটা শুরুর আগে সবিনয়ে পাঠককে জানাতে চাই। আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের বোন বলে যদি তাঁর মতো পাণ্ডিত্য, প্রজ্ঞা, সম-পরিমাণের মেধা আমার লেখায়—আশা করেন তাহলে হতাশ হবেন। আমি বিশ্বাস করি সূর্য একটিই হয়, তবে তাঁর চাঁদ অনেক। আমরা সেই চাঁদের দল। সূর্যের আলোতে আলোকিত হয়ে তাঁকে নিয়ে গর্ব করি।
আমরা ছিলাম সাত ভাইবোন আর আমি তাঁর ঠিক পরে জন্মেছি বলে পিঠাপিঠিও বলা যায়। ছোটবেলা মা হয়তো শিখিয়েছিলেন তাঁকে দাদা বলে ডাকতে, তবে আমি আমার জবানে একটা ‘ই’ যোগ করে ‘দাদাই’ ডাকতে শুরু করি। আমার দেখা দেখি আমার ছোট ভাই বোন দুজনও দাদাই ডাকে। আর ডাকে আমার বন্ধুরা। দেশে ও বিদেশে। 
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের শিক্ষক জীবন, সাহিত্যিক জীবন এবং অন্যসব গুণ নিয়ে দেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ কলামিস্ট, শিক্ষাগুরু, সহকর্মী, ছাত্রছাত্রীসহ অনেকেই লিখবেন, লিখেছেন। আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান নিয়ে তাদের মতো করে লেখার চেষ্টাও করব না। আমি আমার মতো করে তাঁর ছোটবেলার কথা বরং লিখে যাই।
এ লেখাতে আমি আমার ভাইকে দাদাই বলেই উল্লেখ করব আর আমি স্থির বিশ্বাস করি, লেখাটি পড়া শেষে পাঠক আপনিও অশ্রুসিক্ত চোখে একবার দাদাই নামটি উচ্চারণ করবেন নিজের মনে।
আমাদের সাত ভাইবোনকে নিয়ে বাবা-মায়ের একটা সুখী পরিবার ছিল। আমাদের পরিবারটি উচ্চবিত্ত নয়, মধ্যবিত্ত শিক্ষিত একটা পরিবার ছিল। বাবা-মা দুজনেই শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন। তাই শিক্ষকতা আমাদের পারিবারিক শক্তি। আমিও দেশে ও দেশের বাইরে শিক্ষকতা করেছি।
সাত ভাই বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন আপা। দাদাই ছোটবেলা থেকেই আপার খুব ভক্ত ছিলেন। আপাকে তিনি তাঁর একটা বইও উৎসর্গ করেছিলেন। আপার অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। তখন আমরা কুমিল্লাতে ছিলাম।
আমাদের শৈশব শুরু হয় কুমিল্লা শহরে। বাবা-মা দুজনেই কুমিল্লায় বদলি হন। বাবা শিক্ষা বিভাগে, মা কুমিল্লা ফয়জুননেছা স্কুলে। আমরা থাকতাম কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের পাশে। বাসার সামনে মাঠ, তার পরই বিশাল দিঘি ‘রানী দিঘি’। বাবা-মা কাজে চলে যেতেন, ভাইবোনেরা স্কুলে। ছোটবেলা দাদাই কিছু অসুস্থতার জন্য পাঠশালায় যেতে পারছিলেন না। ছোট্ট এই আমিটা তখন তাঁর সারা দিনের খেলার সাথি। আমাদের দেখে রাখার জন্য মা লোক রেখে দিয়েছিলেন। কিন্তু একদিন কীভাবে যেন তাঁদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দুই ভাইবোন দিঘিতে নেমে গেছি। হঠাৎ দূর থেকে বাবাকে আসতে দেখে দাদার বুদ্ধিতে দুজনেই ডুব দিলাম। ছোট মানুষ ছোট বুদ্ধি। বেশিক্ষণ তো ডুব দিয়ে থাকতে পারলাম না। যখন মাথা তুলেছি দেখি বাবা সামনে দাঁড়িয়ে। এরপর কী হয়েছিল তা আর এত দিন পর মনে নেই। তবে এটা মনে করে আমরা মজা পেতাম।
৬১/৬২ সালে আমরা আবার সিলেটে ফিরে এলাম। বাবা খুলনায় বদলি হয়ে গেলেন। বড় ভাই খুব অল্প বয়সে ম্যাট্রিক পাশ করে সিলেট এম.সি কলেজে সাইন্স নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। মেজোভাই স্কুলে। দাদাইও দুর্গাকুমার পাঠশালায় ভর্তি হলেন। আর আমি মায়ের সাথে শিশু স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু করেছি। আমাদের কুমিল্লার জীবনের শেষের দিকে আমার ছোট বোন মিলির জন্ম হয়। আর সিলেটে ফিরে আসার পর ছোট ভাই লিটনের জন্ম হয়। বাবা খুলনা বদলি হয়ে যাওয়ার পর মা আমাদের নিয়ে সত্যিকার অর্থে সংগ্রাম শুরু করেন। সংসার সামলানো, ছেমেয়েদের পড়াশুনা, ছোট দুজনকে দেখাশুনা—সব মাকে একা হাতে সামাল দিতে হতো। তবে আমার ভাইয়েরা অনেক কাজ করতেন, যাতে মায়ের একটু সাহায্য হয়। সেই কাজের অভ্যাস পরবর্তী জীবনে তাদের বেশ সাহায্য করেছে।
বাবা খুলনাতে বসেও ভাইদের পড়াশোনার প্রতি খুব খেয়াল রাখতেন। তিনি তাদের ইংরেজিতে চিঠি লিখতেন। তারা উত্তরে ইংরেজিতেই লিখতেন। ফেরত ডাকে সেই চিঠিতে লাল কালি দিয়ে ঈড়ৎৎবপঃরড়হ করা থাকত। এভাবে ইংরেজিতে তাদের লেখার অভ্যাস তৈরি হলো।
আমরা ভাইবোনেরা বাসার ভেতর খেলাধুলা, দুষ্টুমি, হইহুলোড় করতাম। তবে মা আমাদের খেলাতে বাধা দিতেন না বরং উৎসাহ দিতেন। তাই তো মেজো ভাই আর দাদাই ছুটির দিনগুলিতে সারা দিন ক্রিকেট খেলে কাটিয়ে দিতেন। ঘুড়ি ওড়াতেন পাড়ার মণিপুরি ছেলেদের সাথে। মণিপুরি ছেলেরা ঘুড়ি ওড়ানোতে বিশেষভাবে পারদর্শী ছিল। তাদের ঘুড়ি কেউ কাটতে পারত না। কেউ কাটতে পারতে না। আর ভাইদের সাথে সাথে আমিও তাদের সহযোগী হিসেবে মাঠে থাকতাম।
ভাইবোনদের হইহুল্লোড় থেকে শান্তিলাভের জন্য মা আমাদের হাতে গল্পের বই ধরিয়ে দিলেন। স্কুল লাইব্রেরি থেকেই বই আনতেন মা। পরে দাদাই USIS লাইব্রেরি থেকেও বই আনতেন। এর আর একটা কারণও ছিল। মা প্রচণ্ডভাবে পড়তে ভালোবাসতেন, আর আমাদের কারণে তাঁর বই পড়ায় বিঘ্ন ঘটত। তাই আমাদেরও বই পড়তে উৎসাহ দিতেন। সেই যে আমাদের বই পড়ার অভ্যাস হলো তা আজীবন রয়েই গেল। দাদাই খুব পড়তেন, পড়তে ভালোবাসতেন। বিদেশে গেলে লোকে কত কী কেনে। দাদাই কিনতেন বই। তাঁর সংগ্রহে যে কত বই ছিল! এই বই পড়াটা আসলে পারিবারিক ধারাবাহিকতা। তবে দাদাই সেটা তাঁর মেধার গুণে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে শুরুটা ছিল সহজ একটা সমাধানের গল্প।
ছোটবেলার কথায় ফিরে যাই। দাদাই ছোট থেকেই একটু অন্যরকম, একটু ভাবুক ছিলেন। অনেক কথা শুধু কল্পনা করে, বানিয়ে গল্প বলতেন। এ নিয়ে তাই বড় ভাইয়েরা তাকে ক্ষ্যাপাতেন। কিন্তু এরপরও তিনি তাই করতেন। এখন এই পরিণত বয়সে এসে বুঝতে পারছি, এটা তাঁর সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম হয়ে উঠার পূর্ব প্রস্তুতি ছিল। এটা ছিল তাঁর রূপান্তরের যাত্রা। প্রজাপতি যেমন ধীরে ধীরে তার রঙিন ডানা মেলে দেয়, দাদাই তেমন তাঁর রঙিন বর্ণাঢ্য জীবনের পাখা মেলতে শুরু করেছিলেন।
দাদাই সিলেটে যে স্কুলে পড়তেন তা ছিল সুরমা নদীর পাড়ে। সে সময়ে সুরমা নদী দিয়ে বড় লঞ্চ চলাচল করত। দাদাই স্কুলের শেষে নদীর ঘটে গিয়ে বসতেন, লঞ্চ দেখতেন, যাত্রীদের উঠানামা, কর্মচাঞ্চল্য এসব দেখতেন মন দিয়ে। এদিকে তাঁর বাড়ি ফিরতে দেরি দেখে মা মেজো ভাইকে সাইকেলসহ দাদাকে খুঁজতে পাঠাতেন। মেজো ভাই ঠিক জানতেন তাঁকে কোথায় পাওয়া যাবে। ধরে নিয়ে আসতেন সন্ধ্যা বেলায়। ঘরে ফিরে দাদাই মহাউৎসাহে নতুন কোনো গল্প শোনাতেন মাকে, আমাদেরও।
ভাইয়েরা মজা করত, তবে মা ধৈর্য ধরে শুনে বলতেন, ‘লিখে রাখো, বড় হলে পড়তে ভালো লাগবে।’ আচ্ছা মা কি বুঝে গেছিলেন তাঁর এই ছেলেটি একটু অন্যরকম ? একটু বেশি মেধাবী ? সে ভবিষ্যতে একজন সাহিত্যিক হবে ? নাকি শুধুই উৎসাহ দেওয়ার জন্যই তা বলতেন ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কখনোই আর পাব না জানি।
আমাদের মাকে সিলেটে অনেকে ‘রত্নাগর্ভা’ বলতেন ভাইবোনেরা পড়াশুনায় ভালো, শিষ্টাচার মেনে  চলে পড়ায়, স্কুলে সুনাম আছে। মা কেবল হাসতেন, বলতেন সবই আল্লাহর দান।
বাবা ছিলেন রাশাভারী, গম্ভীর, একটু রাগী আর পড়াশোনা অন্তঃপ্রাণ একজন মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর সাথে আমাদের কিছুটা দূরত্ব ছিলই। বাবা প্রথম জীবনে লেখালেখি করতেন। তিনি ও তাঁর বন্ধুরা মিলে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করেছিলেন ‘আল-ইসলাহ’ নামে। সিলেট সাহিত্য-সংসদ প্রতিষ্ঠাকালে নিজের সংগ্রহের দুই আলমারি বই বাবা সাহিত্য সংসদকে দান করেছিলেন।
বাবা যখন লম্বা ছুটি নিয়ে সিলেট আসতেন, আমরা ভাইবোনেরা খুশি হতে পারতাম না। বড় ভাই-মেজো ভাই আম গাছের আড়ালে ডুবন্ত সূর্যকে দেখিয়ে আমাদের বলতেন, স্বাধীনতা অস্তাচলে চলে গেল। পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতা শেষ হলো। বাবা কত দিন থাকবেন, এটা মায়ের কাছে আমাদের প্রশ্ন ছিল। কারণ বাবা যত দিন বাসায় থাকবেন ততদিন জোরে শব্দ করে কথা বলা যাবে না, হাসা যাবে না। সময়মতো পড়তে বসতে হবে, বাবা টেবিলে এসে পড়া ধরতেন। রাত ৮টায় রেডিওতে বাংলা খবর মানে খাবার টেবিলে বসো তা যতই পরের দিন পরীক্ষা বা অন্য কাজ থাকুক। কাটত J. Nesfield বা N C Choudhury-এর ইংরেজি গ্রামার বই পড়ে। আজকের সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ইংরেজিতে উৎকর্ষ সাধন হয়েছে বাবার এই কঠিন অনুশাসনে। সাথে তিনি পেয়েছিলেন স্কুলের সব থেকে ভালো শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা। শুধু দাদাই নয়, বড় ভাই Pakistan Civil Service পরীক্ষায় ইংরেজি ও বাংলাতে ঈর্ষণীয় নম্বর পেয়েছিলেন। মেজোভাই Bank-এ প্রচুর সুনাম কুড়িয়েছিলেন তাঁর ইংরেজির দক্ষতার করণে, অনেকে হয়তো জানেন না সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাঁর অনার্স পরীক্ষায় Gold Medal পেয়েছিলেন, সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন বলে। শুধু তাই নয়, তিনি বুদ্ধদেব বসুর তৈরি করা রেকর্ড ভঙ্গ করেছিলেন পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁরা কলকাতায় বুদ্ধদেব বসু আর প্রতিভা বসুর সাথে দেখা করতে যান। বুদ্ধদেব বসু তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন বলেছিলেন, আমি তোমার কাছে হেরেও জিতে গেছি। তুমি অনেক দূর যাবে।
শৈশব সততই সুখের তবে তা ক্ষণস্থায়ী। আমার শৈশবটাও তেমনি টুপ করে একদিন শেষ হয়ে গেল। দাদাই তাঁর স্কুল, কলেজ, পড়াশোনা, খেলাধুলা, ছবি আঁকা এসব করতে করতে কখন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলেন।
তখন দেশটা রাজনৈতিকভাবে উন্মাতাল। নির্বাচন হলো। দেশটা আরও অশান্ত হলো। মা দাদাকে সিলেট চলে আসতে লিখলেন। দাদাই খুব চাইতেন অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করবেন। মুক্তিযুদ্ধে যাবেন। তবে তা সম্ভব হয় নি কিন্তু দাদাই থেমে থাকেন নি। তিনি যখন হলে ফিরে গেলেন তখন তিনি ঢাকার যোদ্ধাদের জন্য ম্যাপ তৈরি করে দিতেন। মেট্রিকে তিনি ভূগোলে লেটার মার্ক পেয়েছিলেন। সেই বিদ্যা কাজে লাগিয়ে ম্যাপ তৈরি করতেন। কেউ একজন এসে সেটা নিয়ে যেত তাঁর কাছ থেকে। এ কাজ করতে গিয়ে একবার প্রায় ধরা পড়ে গেছিলেন। তবে তাঁর এক স্কুলের বন্ধু সরকারি দল করতেন বলে তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।
জীবন পরিক্রমায় আমি একসময়ে লন্ডনে স্থায়ী হই। সেখানে চড়ংঃ মৎধফঁধঃরড়হ শেষে একটা ঝবপড়হফধৎু স্কুলে শিক্ষকের কাজ নিলাম। বাড়ি কিনলাম। দাদাই তখন প্রায়ই লন্ডন যেতেন। আমার স্বামী তাকে নিয়ে গাড়িতে করে ইংল্যান্ডের বহু জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যেতেন। আমার মনে পড়ে, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে বেড়াতে গিয়ে দাদাই আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমরা কেউ এখানে পড়তে পারলাম না, তবে ভবিষ্যতে পরিবারের কেউ পড়বে আমি নিশ্চিত। আমার মেজোভাই তখন চট্টগ্রামে পোস্টেড। এক সামারের ছুটিতে আমি দেশে এসেছি। মা মেজোভাইয়ের কাছে থাকতেন। খবর পেয়ে দাদাই গেছেন। সন্ধ্যার পর বারান্দায় বসে সবাই আড্ডা দিচ্ছি। মেজোভাই গান করছেন। হঠাৎ আমার ছয়-সাত বছরের কন্যা টুসি তার মামাকে বলছে, মামা প্লিজ ওই রবীন্দ্রসংগীতটা করো না ? আমরা সবাই হেসে উঠলাম। তবে দাদাই এর মধ্যেও একটা বার্তা পেয়ে গেলেন। বললেন, আমি এটা নিয়ে লিখব। বিদেশে বড় হওয়া একটা বাচ্চা রবীন্দ্রনাথকে জানে আর দেশের কিছু বাবা-মা সযতনে ছেলেমেয়েকে এর থেকে দূরে রাখেন। লিখেছিলেন কি না জানি না।
দাদা শান্ত স্বভাবের ছিলেন। তাঁর রসবোধ ছিল অসাধারণ। এটা তিনি পরিবার থেকে পেয়েছিলেন। আসলে আমরা ভাইবোনেরা যখন একসাথে হতাম, কী নিয়ে যে এত হাসতাম জানি না।
জুন মাসে আমি দেশে ফিরেছি। দাদা খুশি হয়েছিলেন আমি এখন ঢাকা আছি বলে। সেটা যে তাঁর শেষ সাত দিনের জন্য কাজে দেবে, এটা কে জানত ?
হাসপাতালে যে সাত দিন দাদাকে আমি পেয়েছি সেটা শৈশবের দিনগুলোর মতোই ছিল অনেকখানি। যথাসম্ভব তাঁর পাশে থাকা, সেবা করা ছাড়াও কথা বলেছি দুজনে অনেক। যখন মুখে অক্সিজেন মাস্ক বা নল তখন লিখে জানিয়েছেন তাঁর কথা। লেখাগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছি দাদার শেষ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে।
হাসপাতালে দাদাই বলেছিলেন আপা, বড়ভাই, মেজোভাই হাসপাতাল থেকেই পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। আমি জোর গলায় বলেছিলাম, তুমি ফিরবে, তোমাকে ফিরতেই হবে, ভাবির আর কে আছে ? তোমার কত কাজ, কত প্ল্যান, তোমার না ফিরে উপায় নেই। দাদাই একটু হেসেছিলেন। এত প্রচণ্ড মেধাবী ভাই আমার, এই প্রবোধ বাক্য যে কত অসার এটা বুঝতে তাঁর সময় লাগে নি একটুও। হাসপাতালে তাঁর জ্ঞান থাকাকালীন একদিন তাঁর ডাক্তার বেডের কাছে দাঁড়িয়ে তাঁর স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করার জন্য কিছু প্রশ্ন করছিলেন। দাদাই সব মনে করতে পারছিলেন। ঠিক ঠিক উত্তর দিয়েছিলেন। তখন ডাক্তার সাহেব আমাকে দেখিয়ে প্রশ্ন করেন, ইনি আপনার কে হোন ? দাদা বললেন, ও আমার বড় বোন। ডাক্তার বললেন, আমি তো জানি উনি আপনার ছোট বোন। দাদাই উত্তরে বললেন, ছোটবোন তবে বড় বোনের মতো শাসন করে, সেবা করে, আর ভালোবাসে। আসলেও ভাইবোনের সম্পর্কটাই এমনি সহজ, মায়াময় বন্ধুত্বপূর্ণ নির্ভরতার একটা জায়গা। যা কখনো কোনো বর্ণনায় বিশ্লেষণে বলা যায় না। যেমন সুগন্ধী কোনো ফুলকে কখনো তার সুগন্ধ থেকে আলাদা করা যায় না। ছিঁড়ে কুচি কুচি করে টুকরো করে ফেললেও প্রতিটি টুকরোতে সুগন্ধটা থেকে যায়। ভাইবোনের সম্পর্কটাও এমন। মানুষ আর ভালোবাসা এক হয়ে জড়িয়ে থাকে মায়ার বাঁধনে। ভালোবাসার সুবাস ছড়িয়ে যায়।
দাদাই হঠাৎ করে এভাবে চলে যাবেন, তাঁর কাজ, স্বপ্ন, সংসার, সন্তান, নাতি-নাতনি ভাইবোনদের অবাক করে দিয়ে, তাঁর অগণিত ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী, তাঁর বন্ধু, অনুজ প্রতিম বন্ধু, শিক্ষক, সহকর্মী সবাইকে নির্বাক করে দিয়ে এটা মানতে পারছি না। সমরেশ মজুমদারের একটা লেখায় পড়েছিলাম, “মৃত্যু কী সহজ, কী নিঃশব্দে আসে অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকে।” আসলেও দাদাই এমনি সহজ একটা মৃত্যুর ভেতর দিয়ে আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য পরপারে চলে গেলেন। 
যারা সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের আদর্শকে, শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, তাদের জন্য আমার শুভেচ্ছা থাকল।
পরপারে তুমি খুব ভালো থাকো দাদাই।

  

Leave a Reply

Your identity will not be published.