নাসরীন জাহানের নতুন উপন্যাসের প্রচ্ছদ উন্মোচিত হলো

নাসরীন জাহানের নতুন উপন্যাসের প্রচ্ছদ উন্মোচিত হলো

গতকাল ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় ধানমন্ডিস্থ বেঙ্গল শিল্পালয়ে নন্দিত কথাশিল্পী নাসরীন জাহানের প্রকাশিতব্য উপন্যাস ‘ফিনিক্স তোমাকে ভালোবাসি’-র প্রচ্ছদ উন্মোচিত হলো। গ্রন্থটির নান্দনিক প্রচ্ছদটি তৈরি করেছেন আনিসুজ্জামান সোহেল। আর বইটি প্রকাশ করবে অন্যপ্রকাশ। উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানটির আয়োজক ‘অন্যপ্রকাশ’ এবং সহযোগিতায় ‘বেঙ্গল ফাউন্ডেশন’।
অনুষ্ঠানটি শুরু হয় অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলামের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সাহিত্য অঙ্গনে ‘প্রচ্ছদ উন্মোচন’ মোটেও বিরল নয়। প্রায়শই এমনটা হয়ে থাকে। ২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী কাজুও ইশিগুরোর Klara and the Sun বইয়ের প্রচ্ছদ উন্মোচিত হয়েছিল ৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। বইটি প্রকাশিত হয় প্রায় সাত মাস পরে, ২ মার্চ ২০২১। Harper Collins-এর মতো বিশ্বখ্যাত প্রকাশকও গুরুত্বপূর্ণ অনেক বইয়ের প্রচ্ছদ বই প্রকাশের আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরেন।


আমাদের কাছে বিষয়টি  নতুন। এ দেশে ইতিপূর্বে একবারই হয়েছে। ‘অন্যপ্রকাশ’ সেটা করেছিল। ফরিদুর রেজা সাগরের ‘প্রিয়জন আপনজন’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ উন্মোচিত হয়েছিল আনুষ্ঠানিকভাবে। ‘অন্যপ্রকাশ’ দেশের সৃজনশীল প্রকাশনাশিল্পে এরকম অনেক ‘প্রথম’-এর পথপ্রদর্শক। তিনি নাসরীন জাহানের কথাসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলেন, জাদু বাস্তবতাও তাঁর সাহিত্যের একটি বৈশিষ্ট্য।  এ প্রসঙ্গে তিনি নাসরীনের ‘উড়ে যায় নিশিপক্ষী’  উপন্যাসটির কথা উল্লেখ করেন।
অন্যতম আলোচক সেলিম মোরশেদ বলেন, আশির দশকে নাসরীন জাহানসহ আমরা কয়েকজন একসঙ্গে লেখালেখি করেছি। ওর প্রথম চারটি গল্গগ্রন্থে সমাজ বাস্তবতা ফুটে উঠেছে রিয়েলেস্টিক ভঙ্গিতে। ‘সারা রাত বিড়ালের শব্দ’-র মধ্যেই প্রথম অন্য নাসরীনকে দেখা গেল।... তিনি নাসরীন জাহানের প্রথম উপন্যাস 'উড়ুক্কু'-রও উচ্চ প্রশংসা করেন।  তিনি আরো বলেন, নাসরীনের সাহিত্যে নারীরা মননের উচ্চতায় না পৌঁছালে পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে না।...নাসরীনের সৃষ্টি ‘মায়াবাসি’ শব্দটি খুবই চমৎকার। প্রেম বলেন ভালোবাসা বলেন শেষ পর্যন্ত তা মায়াতে রূপ নেয়।
গল্পকার ও ঔপন্যাসিক পারভেজ হোসেন জানান, আনওয়ার আহমদ সম্পাদিত ‘রূপম’ পত্রিকার একটি সংখ্যায় ঠাঁই পেয়েছিল নাসরীনের একটি গল্প ‘পুরুষ’। সেই গল্পটির প্রুফ দেখতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন, বাংলাদেশে এক শক্তিমান নারী লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে। এরপর নাসরীনের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। সেই বন্ধুত্ব আজও বজায় রয়েছে। তিনি একটি অজানা ঘটনার উল্লেখ করেন। সেটি হলো, ‘উড়ুক্কু’ লেখার সময় নাসরীনের বাসায় তুমুল তর্ক হয়েছিল লেখা নিয়ে। রাগ করে নাসরীন উপন্যাসটির প্রথম আঠারো পৃষ্ঠা পাঁচতলা থেকে নিচে ফেলে দিয়েছিলেন। পারভেজ নিচে গিয়ে সেই পুষ্ঠাগুলি খুঁজে এনেছিলেন।
ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বলেন, নাসরীন জাহানের শক্তির দিক হলো, গদ্যশৈলী। অত্যন্ত প্রাকৃতিক। তিনি নাসরীন জাহানের সাহিত্যের মনস্তাত্ত্বিক ও গবেষণামূলক দিক নিয়েও আলোচনা করেন।
নিজের অসুস্থতার কথা তুলে ধরে অনুষ্ঠানে নাসরীন জাহান বলেন, যখনই কলম হাতে নেই, মনে হয় মৃত্যু সামনে দাঁড়িয়ে বলছে ‘আমাকে নিয়ে লেখো’। কিন্তু লেখা শুরু করলেই ফ্যান্টাসি বাড়তে থাকে, পৃথিবীর রূপ, রস ও জীবন চোখের সামনে নতুন করে ভেসে ওঠে। তিনি আরও বলেন, আমি যতদিন আছি এভাবেই যেন থাকি।
সাংবাদিক নজরুল কবির নাসরীন জাহানের ‘ক্রুশকাঠে কন্যা’ উপন্যাসের প্রশংসা করে বলেন, তাঁকে দমিয়ে রাখা যাবে না। আশা করি, মৃত্যুকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে তিনি লিখে যাবেন। 
গল্পকার নুর কামরুন নাহার বলেন, নাসরীন জাহানকে নারীবাদী লেখক কেন বলা হয় ? কারণ তিনি নারীদের হতাশা, নিপীড়ন, সমাজের অন্ধকার দিক তুলে ধরেছেন।
নাসরীন জাহানের এক অনুরাগী পাঠক জান্নাতুল কবিতা বলেন, নাসরীন জাহান শব্দ লিখেন না। শব্দ সৃষ্টি করেন। যেমন, ‘মায়াবাসি’ শব্দটি। তিনি তাঁর পাঠকদের আত্মা দিয়ে ভালোবাসেন। তাঁর স্নেহ পেয়ে তা বুঝেছি। তিনি এখন নানা মাধ্যমে লিখছেন। বোধহয় ক্যানসারকেই ভুগিয়ে দিচ্ছেন।


অনুষ্ঠানের সভাপতি হাসনাত আবদুল হাই বলেন, নাসরীন জাহান এমন বিরল এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন থেকে লেখালেখিকে আলাদা করে দেখা যায় না। নোবেলজয়ী লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বিখ্যাত উক্তি ‘মুভেবল ফিস্ট’ বা ‘চলমান উৎসব’-এর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, নাসরীন জাহান জীবনকে ঠিক তেমনি এক নিরন্তর উৎসবের মতো যাপন করেছেন। গত দুই বছর ধরে কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও এবং শরীরে নানা জটিল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে গিয়েও তাঁর সেই জীবনযাপনের চরিত্র বদলায়নি; তিনি এখনো আগের মতোই প্রাণবন্ত, হাস্যোজ্জ্বল ও কৌতুকপ্রিয়।... হাসনাত আবদুল হাই আরও বলেন, রোগশয্যায় থেকেও তিনি প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাহিত্যগুণসম্পন্ন অনুকবিতা ও প্রবচন লিখে চলছেন, যা তার অদম্য মনোবলেরই প্রকাশ।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে অন্যপ্রকাশের অন্যতম পরিচালক ও পাক্ষিক ‘অন্যদিন’-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সিরাজুল কবির চৌধুরী অনুষ্ঠানের সভাপতি হাসনাত আবদুল হাইকে সাথে নিয়ে পুষ্পস্তবক প্রদান করেন নাসরীন জাহানকে।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করেন অন্যপ্রকাশের অন্যতম পরিচালক ও পাক্ষিক ‘অন্যদিন’-এর নির্বাহী সম্পাদক আবদুল্লাহ নাসের।

Leave a Reply

Your identity will not be published.