আলো যেমন অন্ধকার দূর করে সব কিছু মূর্ত করে তুলে, বই তেমনি মানুষের মনের ভেতরে জ্ঞানের আলোকে প্রজ্জ্বলিত করে অন্ধকারকে দূর করে দেয়। আলো শুধু জাগতিক ভাবে ছড়িয়ে যেতে পারে। আর বই অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান থেকে ভবিষ্যৎ, যুগ থেকে যুগান্তরে জ্ঞানের আলোকে মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে পারে। তাই দেশের সীমানা অতিক্রম করে জ্ঞানের আলোকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে একমাত্র বসেকই। শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের মনকে কখনোই সঠিকভাবে আলোকিত করার সহায়ক মাধ্যম হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন আত্মশিখন। আর বই পড়া সেই আত্মশিখনের শ্রেষ্ঠ সহায়ক হতে পারে। আমার বিশ্বাস, শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না। সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত।
আজকাল তথ্য প্রযুক্তির যুগে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, অসংখ্য দেশী-বিদেশী টিভি চ্যানেল ও মোবাইল ফোনের সুবাদে আমরা বই পড়ার অভ্যাস থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি। হারিয়ে ফেলছি আমাদের জ্ঞান চর্চার আগ্রহ। বই পড়ে সময় নষ্ট করতে চায়না সমাজের অধিকাংশ মানুষ। বাড়ির অধিকাংশ মহিলা /পুরুষরা আমাদের প্রতিবেশী একটি দেশের বস্তাপঁচা জটিল চরিত্রের টিভি সিরিয়ালগুলো দেখতে অতিমাত্রায় আগ্রহী, নূতন প্রজন্মের অধিকাংশই এখন মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ছে। বই পড়ার জন্য এতো সময় কই তাদের ? অথচ বিগত শতাব্দীর সত্তুর থেকে আশির দশকে জন্মগ্রহণ করা আমাদের প্রজন্ম সেবা প্রকাশনীর মাসুদ রানা সিরিজ, তিন গোয়েন্দা সিরিজ, অ্যানি ফ্রাঙ্কের ডায়েরী, এবং টারজান সিরিজের বই পড়তে অতিমাত্রায় আগ্রহী ছিলাম। এছাড়া, সেবা প্রকাশনীর আল কোরআন বাংলা মর্মবাণী, আলোকিত জীবনের হাজার সূত্র, ড্রাকুলা, এবং অন্যান্য অনুবাদিত ও মৌলিক সাহিত্যের বই পড়তেও আমরা অভ্যস্হ ছিলাম । বই পড়তে আমরা অনেকে স্কুলের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে বই কিনতাম । বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশই উনিশ ও বিংশ শতাব্দীতে জন্ম গ্রহণ করা বিখ্যাত অনেক কবি সাহিত্যিকদের রচিত কালজয়ী অসংখ্য বইয়ের সাথে খুব কমই পরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্র চট্যোপাধ্যায়, সত্যেন্রনাথ দত্ত, কবি নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দিন, বিমল মিত্র, নন্দ দাশ, হুমায়ুন আহমেদ,, কবি শামসুর রহমান সহ অসংখ্য কবি সাহিত্যিক আমাদের বাংলা সাহিত্যকে করে গেছেন সমৃদ্ধ। নূতন প্রজন্মের সাথে অতীত ও বর্তমান কবিসাহিত্যিকদের রচিত তাঁদের অনবদ্য সৃষ্ট সাহিত্য কর্মের সাথে পরিচয় করে দেওয়া এখন আমাদের সময়ের দাবী। সেকালে বই পড়া ছিল জ্ঞানার্জনের প্রধান মাধ্যম ও এক ধরনের সাধনা। ঘরে ঘরে বইয়ের তাক, হাতে হাতে পত্রিকা–ম্যাগাজিন—এসবই ছিল দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। সন্ধ্যার পর কেরোসিনের বাতি বা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় মানুষ ডুবে যেত গল্প, ইতিহাস, দর্শন কিংবা কবিতার জগতে। বই পড়া মানে ছিল ধৈর্য, মনোযোগ ও গভীর চিন্তার অনুশীলন। পাঠ শেষে আলোচনা হতো বন্ধুদের সঙ্গে, তর্ক-বিতর্কে শানিত হতো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা। একাল বই পড়ার চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। দীর্ঘ পাঠের বদলে সংক্ষিপ্ত লেখা, স্ক্রল করা তথ্য ও তাৎক্ষণিক বিনোদনই বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। যদিও ই-বুক ও অডিওবুক বই পড়াকে সহজলভ্য করেছে, তবু গভীর মনোযোগে পড়ার অভ্যাস আগের মতো দৃঢ় নয়।
তবে একাল পুরোপুরি নেতিবাচকও নয়। আজ তথ্যের পরিধি বিস্তৃত, বই পাওয়া সহজ, এবং পাঠের ধরন বৈচিত্র্যময়। প্রয়োজন শুধু সেকালের ধৈর্য ও মনোযোগকে একালের প্রযুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া। তাহলেই বই পড়া আবারও হয়ে উঠতে পারে মননশীলতা, মানবিকতা ও জ্ঞানের এক অনন্য সেতুবন্ধন একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি জ্ঞান লাভের আশায় বই পড়তে নতুন প্রজন্মের কেউ আগ্রহী নয়। হাতে বই নিয়ে পড়ার তৃপ্তির অন্য কোনো বিকল্প মাধ্যম হতে পারে না। কবি-সাহিত্যিকদের গল্প-উপন্যাস পড়তে গেলে আমাদের বই পড়তে হবে। ই-বুকে গল্প উপন্যাস পড়া সম্ভব না । লাইব্রেরিতে থাকা অগণিত বইয়ের মাঝে প্রয়োজনীয় বইয়ের খোঁজে আমাদের লাইব্রেরীতেই যেতে হবে। এটা হচ্ছে বাস্তবতা। একটা সময় জ্ঞানপিপাসু মানুষদের বিনোদনের মাধ্যম ছিলো বই পড়া। অবসর সময় কাটাতে বই ছিলো তাদের নিত্যসঙ্গী। অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষ এখন বই পড়ার অভ্যাস থেকে দ্রুতই দূরে সরে পড়ছে। আমরা প্রবীণরা কিন্তু এখনো বই পড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। একজন মানুষের নৈতিকতা, আদর্শ, মানবিক মূল্যবোধ ও বিবেককে জাগ্রত করতে হলে বই পড়ার কোনো বিকল্প হতে পারে না। বই পড়লে আমাদের ভাবনার জগতটা প্রসারিত হয়। মনের অশান্তি দূর হয়। ভাষার ওপর দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা আমাদের সুপ্ত অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তুলতে কিংবা প্রকাশ ঘটাতে আমাদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
মানুষ সামাজিক জীব। সে প্রতিনিয়ত অন্যের সঙ্গ ও সান্নিধ্য কামনা করে আসছে। মানুষের সঙ্গলাভের এ প্রবৃত্তি কেবল মানুষকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। যুগ যুগ ধরে সে গ্রন্থের সঙ্গও কামনা করে আসছে। কেননা মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার অনুভূতি নিজের বুকে নিয়ে অনাগত পাঠকের জন্য চির অপেক্ষমাণ হয়ে আছে বই। প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের জ্ঞানভান্ডার আজ মহাসমুদ্র হয়ে স্বল্পায়ু মানুষের জ্ঞান-পিপাসা মিটানোর অপেক্ষায় আছে বইয়ের রূপ ধারণ করে। জ্ঞানের মহাসমুদ্রের কল্লোল শোনা যায় বইয়ের পাতায়। মানুষ তার আত্মার আত্মীয়ের কথা বিশ্ব মানবের সাহচর্য ও সঙ্গ লাভ করে গ্রন্থের মাধ্যমে। অনাদিকাল থেকেই গ্রন্থ পাঠে মানুষ অনাবিল শান্তি লাভ করে আসছে। তাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি। বিশাল বিশ্বের আয়োজন মোর মন জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারই এক কোণ। সেই ক্ষোভে পাড়ি গ্রন্থ ভ্রমণ বৃত্তান্ত আছে যাহে অক্ষয় উৎসাহ”
ছোটোবেলা থেকে আমি যে পারিবারিক আবহের মধ্যে বড় হয়েছি সেখানে আমার বাবা-মাকে তাদের অবসরে বই পড়ে সময় কাটাতে দেখেছি। আমার প্রয়াত মাকে বড়ো বড়ো গল্প-উপন্যাস ও ধর্মীয় বই পড়তে দেখেছি। বই পড়া ছিলো ওনার অত্যান্ত শখের বিষয়। ধর্মীয় আদর্শ ও অনেক নৈতিকতার কথা মা আমাদের বই পড়ে শোনাতেন এবং বাস্তব জীবনে তিঁনি আমাদের ভাইবোনদের মেনে চলতে সব সময় উপদেশ দিতেন। অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নিহাররঞ্জন গুপ্ত ও বিমল মিত্রের গল্প-উপন্যাসগুলো আমার মায়ের বিশেষ পছন্দের ছিলো। আমার মায়ের সংগ্রহের অনেক বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আমার নানার বাড়িতে বই পড়ার ব্যাপক প্রচলন ছিলো। আমার মায়ের আপন চাচাতো ভাইদের কয়েকজন ছিলেন বইয়ের পোকা। ওনাদের ঘরগুলো ছিলো একেকটা লাইব্রেরী। আমার সেই মামাদের জ্ঞানের গভীরতা, ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও কর্মজীবনের বহু গল্প আমি আমার মায়ের মুখে অনেক শুনেছি। বই পড়ার প্রতি গভীর আগ্রহ আমার মা যে আমার নানার বাড়ি থেকে পেয়েছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জীবনে আমি অনেক বই পড়েছি। ঠিক যে কারণে আমার জীবনের চাওয়া-পাওয়া, কর্ম ও ভাবনার জগতটা আর দশজন মানুষ থেকে কিছুটা আলাদা। প্রকৃত বিদ্যা মানুষকে নম্র ও ভদ্র হতে শিখায়। বই পড়লে জ্ঞান সমৃদ্ধ হয়, যার প্রকাশ ঘটে মানুষের ব্যক্তিত্ব ও কর্মে। দুঃখের বিষয় আজকাল নূতন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ক্লাসের পাঠ্যসূচীর বাইরে অন্য কোনো বই পড়তে আগ্রহী নয়। ওরা না পড়ে কালজয়ী কোনো লেখকের গল্প-উপন্যাস, কবিতা কিংবা অন্য কোনো জ্ঞানের বই । ওদের মনের মানবিক অনুভূতিগুলো ঠিক আমাদের সময়কার মতো নয়। বই না পড়ার অভ্যাসের কারণে ওদের জীবন দর্শন পাল্টে বস্তুবাদী হয়ে গেছে। আগেকার দিনের বইগুলোর মধ্যে শিক্ষণীয় অনেক কিছু ছিল। এখনকার প্রজন্ম ইতিহাসের বই না পড়ার কারণে ওদের সামনে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করলে অবাক বিস্ময়ে ওরা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। অতীত ইতিহাস না জানলে মানুষ ইতিহাস থেকে কীভাবে শিক্ষা নিবে ? সেটা আমার কাছে মোটেই বোধগম্য নয়। প্রতিটি গল্প-উপন্যাসের সাথে মিশে আছে সেই সময়কার সভ্যতা, সাংস্কৃতি, মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও ইতিহাস। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচিত মোট পাঁচটি বই ব্রিটিশ আমলে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। তার মধ্যে ‘বিষের বাঁশী’ ও ‘ভাঙার গান’ নিষিদ্ধ হওয়ার শতবর্ষ পূর্ণ হলো চলতি ২০২৪ ইং সালের গত অক্টোবর মাসে। ব্রিটিশদের ফৌজদারী দণ্ডবিধি ৯৯ ধারায় কাজী নজরুল ইসলামকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু কী কারণে বই দুটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো আর কী লেখা ছিলো ব্রিটিশ বিরেধী বই দুটিতে...? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমদের বইগুলো পড়তে হবে। আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, সাংস্কৃতি, অর্থনীতি ইত্যাদি সব জানতে হলে বই পড়া আবশ্যিক। আগে বই পড়ার জন্য পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগে ছোটো ছোটো পাঠাগার গড়ে তুলতে দেখা গিয়েছে। সকল বয়সের জ্ঞানপিপাসু পাঠকদের আনাগোনা ছিল সেই পাঠাগারগুলোতে। কালের স্রোতে পাঠকের অভাবে সেইসব পাঠাগারগুলো অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় ‘গণ উন্নয়ন গ্রন্থাগার’ নামে বিদেশী অর্থায়নে একটি বড় মাপের পাঠাগার ছিলো। আমি সেই গ্রন্থাগারের একজন আজীবন সদস্য ছিলাম। বাসার কাছে হওয়ায় সেই পাঠাগারে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিলো। পাঠক সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ায় সেই গ্রন্থাগারটি সম্ভবত বাড়ি ভাড়া কমাতে অন্য জায়গায় স্থানান্তর হওয়ার খবর পেয়েছি। ঠিকানা না জানিয়ে অন্যত্র স্থানান্তরিত হওয়ার বিষয়টি আমার কাছে ভালো লাগে নি । গত কয়েক বছর আগে আমাদের গ্রামের বাড়ি গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার ঘোনাপাড়া গ্রামে আমার মরহুম পিতা ও চাচার স্মৃতি স্মরণে আমরা নিজ খরচে একটি সুসজ্জিত পাঠাগার তৈরী করে দিয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, পাঠকের অভাবে গতবছর সেই পাঠাগারটি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। পাঠাগারের অসংখ্য বই করে রাখা হয়েছে বস্তাবন্দি। আমাদের গ্রামের মসজিদে একটি ছোটো পাঠাগার করে দিয়েছিলাম আনুমানিক দুই দশক আগে। সীমিত পাঠকের কারণে আমাদের নিজ হাতে গড়া মসজিদভিত্তিক সেই লাইব্রেরির প্রচার ও প্রসার ঘটেনি। অথচ এই লাইব্রেরীর সংগ্রহে রয়েছে ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল অতীত ইতিহাসের অসংখ্য দুর্লভ বই, পূর্নাঙ্গ ইসলামি বিশ্বকোষের সমাহার, পবিত্র কোরআন শরীফের তফসিরসমূহ, বোখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, তিরমিজি শরিফসহ অসংখ্য প্রয়োজনীয় বইয়ের সংগ্রহ।
একথা সত্যি যে, আমাদের দেশে বর্তমান সময়ে ভালো মানের লেখকের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অবশ্য সাদাত হোসাইনসহ কয়েকজন প্রতিভাবান তরুণ, লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে, এ কথাও সত্যি। যাই হোক একদা এদেশের তরুন প্রজন্মের পাঠককুল যারা বই পড়া থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে পড়েছিলো জনপ্রিয় নন্দিত কথাসাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ূন আহম্মেদ সেই সময়ের তরুণ প্রজন্মকে ওনার অসাধারণ লেখনীর জাদু শক্তি দিয়ে বই পড়ার দিকে টেনে আনতে পেরেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর সাড়া জাগানো এই গুণী লেখক বাংলা সাহিত্যকে নতুন করে প্রাণ দিতে পেরেছিলেন। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই ঘাতক ব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত এই কালজয়ী লেখকের অকাল মৃত্যু হলে বাংলা সাহিত্য চর্চায় এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। ওনার শূন্যতায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাংলাভাষী পাঠককুলে। বহুমাত্রিক এই গুনী লেখক হুমায়ুন আহমেদ বেঁচে থাকলে তিঁনি বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়ে যেতে পারতেন। অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন...“বই পড়াকে যথার্থ হিসাবে যে সঙ্গী করে নিতে পারে, তার জীবনের দুঃখ কষ্টের বোঝা অনেক কমে যায়”।
বিখ্যাত প্রাবন্ধিক, কবি ও লেখক প্রমথ চৌধুরী বই পড়া নিয়ে লিখেছেন...“বই পড়া শখটা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শখ হলেও আমি কাউকে শখ হিসেবে বই পড়তে পরামর্শ দিতে চাইনে। প্রথমত সে পরামর্শ কেউ গ্রাহ্য করবেন না, কেননা আমরা জাত হিসেবে শৌখিন নই। দ্বিতীয়ত অনেকে তা কুপরামর্শ মনে করবেন। কেননা আমাদের এখন ঠিক শখ করবার সময় নয়। আমাদের এই রোগ-শোক, দুঃখ-দারিদ্র্যের দেশে সুন্দর জীবন ধারণ করাই যখন হয়েছে প্রধান সমস্যা, তখন সেই জীবনকেই সুন্দর করা, মহৎ করার প্রস্তাব অনেকের কাছে নিরর্থক এবং নির্মমও ঠেকবে। বই কিনলেই যে পড়তে হবে, এটি হচ্ছে পাঠকের ভুল। বই লেখা জিনিসটা একটা শখমাত্র হওয়া উচিত নয়, কিন্তু বই কেনাটা শখ ছাড়া আর কিছু হওয়া উচিত নয়। বই কিনে কেউ কোনোদিন দেউলিয়া হয় না”।
বইবিমুখতার কারণে আমাদের দেশে শতশত পাঠাগারগুলো যেনো তৈরি হচ্ছে জাদুঘরে। বিজ্ঞান, অর্থনীতি যত এগিয়েছে, মানুষ তত বেশি স্বার্থপর ও বস্তুবাদী হয়ে উঠছে। এই ভারসাম্যহীনতা সংশোধন করতে, মানুষকে শেষ পর্যন্ত বইয়ের দিকে ঝুঁকতে হবে। অন্যথায় প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করা যাবে না। নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে ধারণা করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা । সুষম শিক্ষা ব্যতীত শিক্ষার্থীরা শক্তিশালী নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে পারে না। আমাদের সন্তানদের জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী করতে হবে, পড়ার ভেতরে তাদের আনন্দ খুঁজে নিতে হবে।
বই হচ্ছে জ্ঞানের আধার। গ্রন্থ পাঠে মানুষের মনে আসে আনন্দ-বেদনার কাব্যিক দার্শনিক সত্যবোধ। গ্রন্থ পাঠের প্রভাবেই মানবজীবন সুন্দর ও নিখুঁত থাকে। গ্রন্থ পাঠই আমাদের মনে এনে দেয় নীতি, সহানুভূতি, মায়া-মমতা ও প্রেম-প্রীতি। যুগে যুগে গ্রন্থ এনেছে ত্যাগের দীক্ষা, সত্য ও সুন্দরের সাধনা। ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি গ্রন্থ পাঠ করে মানুষ মেটাচ্ছে তার মনের ক্ষুধা। গ্রন্থপাঠ মানুষের দৃষ্টিকে করে উদার, মনকে করে উন্নত। দুঃখ-কষ্ট, শোক-তাপ, হতাশা-অবসাদ, দ্বন্দ্ব- সংঘাতপূর্ণ পৃথিবীতে গ্রন্থ পাঠেই মানুষ আনন্দ লাভ করতে পারে। পরিশেষে একটি কথাই বলতে চাই...
আমরা পাঠকশূণ্য পাঠাগার দেখতে চাই না। আমরা সমাজে আলোকিত মানুষ দেখতে চাই। উন্নত জাতি ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে বন্ধ হয়ে যাওয়া পাঠাগারগুলো আবার খুলে দিতে হবে। এটা এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply
Your identity will not be published.