ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি (পর্ব-২) হেলেনিক সৌরভ

ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি (পর্ব-২)  হেলেনিক সৌরভ

[ভ্রমণ গদ্যের পাঠকদের কাছে একটি সুপরিচিত নাম, হুসেইন ফজলুল বারী। তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য হলো, তথ্য সমৃদ্ধ হলেও তা একঘেয়ে নয়। কেননা তথ্যগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে; মিশে থাকে গল্পের সঙ্গে। নিসর্গের বর্ণনা অপরূপ। আর তাঁর ভাষায় কবিতার গন্ধ রয়েছে। কখনো-সখনো অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহারও লক্ষণীয়।

গত সংখ্যা থেকে ‘অন্যদিন’-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে হুসেইন ফজলুল বারী’র ভ্রমণকাহিনি ‘হেলেনিক সৌরভ’। এটি গড়ে উঠেছে গ্রিসের পটভূমিতে—যেখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে সেই দেশের মানুষ, প্রকৃতি এবং পুরাণের নানা বিষয়।]

একদম কাছ দিয়ে গাড়ি যাওয়ার সময় লক্ষ করি, রোদেপোড়া পাহাড়ের গায়ে ম্রিয়মাণ মস, ঘাস আর অজস্র নীল-সাদা ফুল। অনেক জায়গায় ধুলোর আস্তরণে প্রকৃতির নগ্ন রূপ কিছুটা আড়ালও হয়েছে। এদিকে সবুজের আভাস পেয়ে চালক চাপ দেয় গাড়ির এক্সেলেটরে। প্রায় অব্যতিক্রমী শুষ্ক পর্বত আর কাঁটাগাছ ঝোপ দেখতে কাঁহাতক ভালো লাগে! আমার ভেতরটাও যেন শুকিয়ে আসছিল। আমি বারণ করায় একটু আগে সুঠাম চালকের গ্রিক মেশানো ইংরেজির শ্রুতিকটু বকবক থেমেছে। আমার অপরিমিত ঔৎসুক্যে সে মনে হয় ধান্ধা করেছিল কীভাবে গাড়ি ঘুরিয়ে আমাকে তার পছন্দের অন্য অতিথিশালায় নেয়া যায়। তৃষ্ণার্ত আমি ঠান্ডা পানিতে গলা ভিজিয়ে নিলাম। একসময় ঝিমুনির মতো লাগে। লম্বা দম নিয়ে চোখ বন্ধ করি। রাতে ভালো ঘুম হয় নি। সম্ভবত কাকঘুমে এলিয়েও পড়েছিলাম। দুরূহ এক বাঁক পার হতে গাড়ির চাকার বেসুরো ঘর্ষণে চোখ মেলি। পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গেলমানরূপী একদল কিশোরের হাতে দেখি শৃঙ্খলিত ঘুড্ডির পাল। বাতাসের ঝাপটায় ঘুড্ডির সর্পিল লেজ আচমকা নেচে উঠল। বুঝতে পারলাম, এজিয়ান সাগর হয়তো খুব দূরে নয়। আরেকটু চলতেই লক্ষ করলাম, সাগরের রুপালি কিনারা তাজিম করে ধ্যানী পাহাড়ের পবিত্র চরণ ধুয়ে দিচ্ছে।

এদিকটায় বেশ সবুজ প্রকৃতির আনাগোনা। এবার গাড়ি চলছে শুকনো মাঠের বুক চিরে। এখানকার প্রান্ত-দিগন্ত যেন কোনো নিপুণ পটুয়ার আঁকা মনোহর প্রচ্ছদ। কখনো চোখে পড়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামছে বুনো ঝিরি। জলের বুকে প্রখর সূর্য প্রতিফলিত হয়ে হারিয়ে যায় দিকচক্রবালে। পাশে মসে-ছাওয়া ঘুপচি ঘর, এলোমেলো প্রত্নসম্ভার। দূর থেকে ঠিক আঁচ করা যায় না, একেবারে কাছ দিয়ে গাড়ি চলবার সময় চমকে উঠেছি—রিক্ত মাঠ, বর্ণময় শিলা বা মসৃণ জমিনে নরম গুল্মের মায়াবী ছাপ। সবুজ, হলদেটে বা লালচে ঘাসের অফুরান বিস্তার এদিকে। চোখে পড়ে আঙুরলতার ঝাড় আর ডুমুর বন। যতই নিচে নামছি ততই স্পষ্ট হচ্ছে প্রাণপ্রাচুর্য। অদূরের সতেজ আপেল বাগান আর প্রাণময় ভুট্টা খেত। এককোণে লতাপাতার সবুজ দোপাট্টা পরা বেশ একটা পুরোনো বাড়ি। এর কোল ঘেঁষে ছোট্ট ইঁদারা। দূরের আকাশে সান্ত্রী দেয় অজস্র ঈগল পাখি। কয়েকটা আবার অনেকখানি নিচে নেমে লোভাতুর দৃষ্টিতে খেতের দিকে চেয়ে আছে—কখন একটা শিকার মিলবে। একটা পাতাবহুল গাছের ছায়ায় রংচটা গাগরা পরে পোষা কুকুরকে নিয়ে খুনসুটিতে মেতেছে এক কিষান বধূ। গাড়ির জানালা খুলে দিলাম। বাতাসের শোঁশোঁ আর সাগরের দূরাগত আর্তনাদ মিলে যেন এক অপার্থিব অনুনাদের সৃষ্টি হয়েছে। চোখে পড়ল, মাথায় পট্টিবাঁধা সক্রেতিসের উত্তরপুরুষ এক ব্যস্ত রাখালকে। বেচারা গড্ডলিকার প্রবাহ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বেশ। ভর দুপুরে কামার্ত এক প্রাণীযুগল অভিসারে মেতেছে। অপ্রসন্ন মানুষটি সম্ভবত বেশ উচ্চস্বরে কী একটা গালিও পেড়েছে বেহায়া লোমশ ভেড়া দম্পতিকে। কথা না বুঝলেও অন্তত দূর থেকে প্রৌঢ় কিষানের হতাশামাখা ধ্বনিসহ তার অভিব্যক্তি দেখে আমার অন্তত তাই মনে হলো। আঁচ করে নিলাম, এখানে মনে হয় আমাদের চাটগাঁর মতো গালাগালের প্রবণতা। আবার মনে হলো, গালাগাল মূলত আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ আর যে-কোনো ভাষার অন্যতম অনুষঙ্গই তো হলো খিস্তিখেউর। স্বয়ং সক্রেতিস বিশ্বাস করতেন, গালি দেওয়ার ব্যাপারে তার বেগম জানথিপির সমকক্ষ অন্তত গ্রিসে কেউ নেই।

এই গ্রিক জনপদের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে আমাদের গাড়ি ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল। অনিন্দ্যসুন্দর অজস্র অতিথিশালা দেখে মন ভালো হয়ে গেল। রোদ বিমর্ষ হয়—একটু ছায়া নামে। বাতাসের স্নিগ্ধ আমেজ গা জুড়িয়ে গেল। সারবন্দি জলপাই আর পাম গাছের ছায়া মাড়িয়ে খানিকটা ক্লান্তি নিয়ে হাজির হই হোটেলের লবিতে। তৃষাতুর চোখে এদিক-ওদিক তাকাই—কত সব নীল গম্বুজের কতসব সফেদ স্থাপনা রয়েছে ওই পাহাড়ি জনপদে।

আমি গেস্টহাউসের বাইরে বসি। সাগর-সন্নিহিত পাথুরে স্থাপনার গায়ে আছড়ে পড়ছে ছোট-বড় ঢেউ। সাগরের গর্জন শুনি। লোনা বাতাস লাগে চোখে-মুখে-বুকে। একটু আগে জোয়ার পূর্ণ হওয়ায় জলধি এখন অনেকটাই শান্ত। সাগরের কোল ঘেঁষে রাশি রাশি নীল-সাদা জাহাজ সারি বেঁধে নীল মখমলের জলে বুঝিবা অবেলায় ঝিমিয়ে পড়েছে। কিছু জাহাজ রংচঙে। বহির্নোঙরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল প্রমোদতরী। তটের কাছাকাছি ছোট-বড় জলযান একটু-আধটু দুলছে বুঝি—পাহাড়ের উঁচু থেকে দেখতে বড়সড় রাজহাঁসের মতো দেখায়। সাগরের জলরাশির অবাধ্য কিনারা এখন নিরুপায় বিচারপ্রার্থীর মতো নিরন্তর মাথা কুটে যেন পাহাড়ি জনপদকে কী একটা আর্জি জানায়। কী জানি, অকূল জলধির এমন কী ব্যথা ? জলাঙ্গীর সর্বাঙ্গ প্রগাঢ় নীল—জেট ব্লু।

নীল চোখের এক এলোকেশী তরুণী সাদর সম্ভাষণ জানাল শরীরে তরঙ্গ ফুটিয়ে। ওয়েলকাম ড্রিঙ্কসে চুমুক দিয়ে আমি চোরা চাহনিতে তার চোখের দিকে তাকাই। চমকে উঠলাম। মানুষের চোখ এত নীল হয় ? সে কি চোখজোড়ায় কিছু মেখেছে ? কতই-বা তার বয়স হবে-বাইশ-তেইশ ? সে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বাতচিত করছে হোটেলের সুবিধা আর নিয়মনীতি নিয়ে। পাতলা ঠোঁটের এই মেয়েটির গায়ে ফিনফিনে পোশাক। তার অপরূপ নাসিকা, সরল নিষ্পাপ চোখ—যেন জ্যামিতির হিসেবে বসানো হয়েছে তার নিপাট মুখয়ব—মনে হয় সে যেন এই মর্ত্যরে পৃথিবীর কেউ নয়!

রূপবতী তরুণী গজদন্ত বেঁকিয়ে তাড়া দেয়, কী ভাবছেন, জনাব, চেক ইন করতে হবে না ?

সংবিত ফিরে পেয়ে বললাম, তথাস্তু।

হোটেলবালা ট্রলি টেনে টেনে সামনে এগোয় নিতম্ব দুলিয়ে। আমিও তাকে অনুসরণ করি আর তাকাই এদিক-সেদিক। অভ্যর্থনা থেকে আমার থাকবার কক্ষটি কয়েক শ’ হাত দূরে। অপ্রশস্ত পথের দুধারে অলিভ গাছ আর পরিপাটি ঝাউবন। ফাঁকে ফাঁকে সাদা পাথরের নগ্ন মূর্তি। তবে সব পুরুষ মানুষের ভাস্কর্য। পুরুষের নগ্নতাকে নাকি গ্রিসে বীরত্বের প্রতীক মনে করা হতো। বলতে গেলে, প্রাচীন গ্রিসে নারীগণ ছিলেন অপাঙ্ক্তেয়। সাত বছর বছর হলেই মেয়েশিশু অন্তরীন হতো অন্তঃপুরে, বছরে দুই-একবার নাটক দেখতে বা দেবদেবীর আশীর্বাদ পেতে বাইরে যেতে পারত অবরোধবাসিনী নারী। গ্রিসে এখন নারীদের অবাধ গতি। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, অর্থোডক্স খ্রিষ্টীয় মতবাদে বিশ্বাসী গ্রিসে নারীগণ ভোটাধিকার পেয়েছে উনিশ শ’ সত্তরের দশকে।

বাতাসের ছোঁয়া পাই। বাতাসে কেমন যেন লবণ লবণ গন্ধ। রোদ কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। নিজ কক্ষে প্রবেশ করে দেখি, ফ্রিজ ভরতি শুধু দ্রাক্ষারসের বোতল। অভ্যর্থনায় ফোন করে চাইলাম ঠান্ডা জল। আরেক মেয়ে হাজির হলো এক জোড়া কঠিন পানীয়ের বোতল নিয়ে। তার চোখের অভিব্যক্তি অনেকটা এরকম—লাগলে বলো, আরও এনে দেব। আমার অবস্থা অধিক শোকে পাথর হওয়ার অবস্থা।

আমি বিরক্তি প্রকাশ করলে ওয়েট্রেস বলল, এখানকার এই নিয়ম—হোটেলে পানি চাইলে সুরা পাঠিয়ে দেয়। পানির চেয়ে মদ সস্তা হওয়ায় মানুষজন টাকা দিয়ে কিনে নাকি দ্রাক্ষারস খায়। সে আবার পরামর্শ দিল, এখানকার কলের পানি একদম নিরাপদ। বেসিনে এক জোড়া গেলাস দেওয়াই আছে। শেষে চোখের পাপড়ি দুলিয়ে হেসে বলল, প্রিয় জনাব, সান্তরিনিতে পানীয় জলের চেয়ে দ্রাক্ষারস বেশি, মানুষের চেয়ে ভেড়া বেশি আর কুলবধূর চেয়ে অভিসারিকা বেশি!

এবার আমার লা জওয়াব হওয়ার পালা।

ছোট্ট বেলকনিতে বসলে দৃষ্টি আটকে যায় অপূর্ব সব স্থাপনার দিকে। চুমুকে চুমুকে ক্লান্তি দূর করি। নিচের দিকে অতল সমুদ্র, এদিকে অজস্র পাথুরে পাহাড়। প্রকৃতি প্রায় অবিকৃত রেখে পাথুরে পাহাড় কেটেকুটে থরে থরে বানানো হয়েছে অপরূপ সব আবাস, হোটেল, রেস্তোরাঁ, বার আর কটেজ। এখানকার স্থপতিরা অসাধারণ কাজ করেছেন। পাথরে তো আর ফুল ফোটে না, তাই অতিথিশালা বা রেস্তোরাঁর দহলিজে রয়েছে বহু যত্নে লালিত সবুজ লতা আর রঙিন ফুলের কেয়ারি।

দুপুরে খেয়ে-টেয়ে একটু জিরিয়ে নিলাম। বহুদিন পর ভাতঘুম দিলাম আরামসে। রোদ কিছু ঝিমিয়ে এলে ঘুরতে এলাম। গ্রিসের এক প্রান্তের ছোট্ট দ্বীপ সান্তরিনি। পর্যটকে সয়লাব শৈলনিবাসটির কত যে অলিগলি! আমার যেন খেই হারাবার অবস্থা। তবু উৎসুক মন নিয়ে জনস্রোতকে অনুসরণ করে হাঁটতে শুরু করি ঊর্ধ্বমুখি হয়ে। মুখরিত মানুষেরা চলছে গড্ডলিকা মতো। পথে-ঘাটে-রেস্তোরাঁয় নানান কিসিমের ভ্রামণিক। আগুয়ান পথচারীদের মাথায় বাহারি হ্যাট আর চোখে রোদচশমা। আমিও চশমার আড়ালে দেখি, বিকেলের সোনাঝরা রোদ এসে ঠিকরে পড়েছে পাথুরে পাহাড়ের গায়ে। এদিকে আবাস, রেস্তোরাঁ আর গির্জার অনিন্দ্য বিন্যাস। এদের রং দুগ্ধধবল। কিছু স্থাপনায় নীল অবতল মস্তক। প্রাসাদ-লাগোয়া গম্বুজজুড়ে তাজা আঙুরলতা,পাতাবাহার আর বাগানবিলাসের বিস্তার। কত কিসিমের মানুষের যে আনাগোনা পথে পথে! প্রাণবান তরুণ-তরুণীরা সংখ্যাগুরু। পথে পথে ঝলমলে অপ্সরাদের যেন মেলা বসেছে। দিনে-দুপুরে তাদের খোলামেলা বেশবাস আমার গেঁয়ো চোখে বিসদৃশ ঠেকে। এদেশে কি কাপড়-চোপড় দামে আক্রা ?

অদূরে পাহাড়ের বুক চিরে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে শঙ্খশুভ্র প্রলেপে ঢাকা অপূর্ব সব প্রাসাদের সারি। এদের মস্তকে আবার অনিন্দ্যসুন্দর নীল নীল গম্বুজ। এর উপরে অতি মনোহর বৃহৎ ঘণ্টা আর ক্রুশের যুগলবন্দি। সবার উপরে পতপত করে উড়ছে নীল-সাদা নিশান-গ্রিসের জাতীয় পতাকা। সাধারণভাবে আঁচ করে নিলাম—হয়তো সফেদ আসমান আর নীল সাগরের প্রতীক হিসেবে এখানে সাদা আর নীলরঙা প্রাসাদের আধিক্য। পরে এক গ্রিক সহপাঠী মারিয়ার কাছে জেনেছি, এদিকটা প্রচণ্ড উত্তপ্ত বলে কালচে বা ধূসর পাথর যাতে সব আলো শুষে নিয়ে প্রচণ্ড উষ্ণ হয়ে উঠতে না পারে সেজন্য এই দ্বীপের বাসিন্দারা সব পাথুরে ঘরে সাদারঙের প্রলেপ দিত—যাতে গরমটা অসহনীয় না হয়। একসময় নাকি সন্তরিনিতে ভয়াবহ কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল—স্থানীয় মানুষজন সাদা চুন দিয়ে করে ঘরদোর জীবাণুমুক্ত করত। এই দ্বীপে চুনাপাথর সুলভ ও সহজলভ্য হওয়ায় স্থানীয় জেলেরা বাড়িঘরে সাদারঙের চুন মাখত। ১৯৬৭ সালে এক সেনা শাসক জাতীয়তাবাদী জজবায় আইনও জারি করে দিলেন, গ্রিক দ্বীপের সকল স্থাপনা গ্রিক পতাকার অনুসরণে সফেদ আর নীলবরণ করতে হবে। সব জায়গাতেই কিছু নিপাতনে সিদ্ধ ব্যাপার থাকে—যারা আইন বা সমাজের দোহাই মানতে চায় না। সেজন্য হয়তো এখানকার অল্প কিছু স্থাপনা অবশ্য লালচে-মেটে রঙেও সেজেছে। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে জলপাই বা হলদেটে রঙের গুহা। তবে দৃষ্টিকটু ঠেকে না। অপূর্ব কিছু প্রাসাদের গায়ে এঁটে আছে ছোট-বড় মর্মর মূর্তি। আশপাশে দেখি বাগানবিলাসের বর্ণিল ঝাড়বা রংচঙে ফুল বা পরজীবী অর্কিড। এইসব পাথুরে দালান-কোঠা শৈলী আর বিশালত্বে অনন্য। আমি হাঁ হয়ে এইসব দেখি। কিছু রেস্তোরাঁর চাতালে রয়েছে নানান কিসিমের বনসাই। এদিকে পাথরের বেঞ্চিতে বসে সুরা পান করতে করতে সাগরের বুকে সূর্য ডুবে যাওয়ার দৃশ্য দেখা নাকি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। 

এক পর্যায়ে গাড়ি থামিয়ে ত্রস্তপায়ে জনস্রোতে শামিল হলাম। কত রংবেরং-এর মানুষের আনাগোনা যে চারদিকে। তাদের গায়ে বিচিত্র সব পোশাক-আশাক। তবে চারধারে স্বল্পবসনা সুন্দরীদের ভূমিধস আধিক্য। এমনিতে কেউ কারও দিকে বিসদৃশভাবে ফিরে চায় না। নারী-পুরুষ কেউ পুরোপুরি সতর ঢাকে নি। ছেলেরা কিছুটা ভদ্রস্থ পোশাক পরেছে, অনেকের গায়ে রংচঙে শার্ট বা গেঞ্জি। অপরূপ মেয়েরা গায়ে জড়িয়ে রেখেছে খামোখা অজুহাতের মতো মোলায়েম পোশাক। জানি, অপরিচিত কারও দিকে তিন সেকেন্ডের থেকে বেশি সময় একদৃষ্টে চেয়ে থাকা অভদ্রতা। তবু বেকুবের মতো হা হয়ে দেখি নানান কিসিমের মানুষজন। কারও সাথে ক্বচিৎ চোখাচোখি হলে মৃদু হেসে সম্ভাষণ জানায় এই যা। মধুচন্দ্রিমায় আগত কপোত-কপোতীদের স্বর্গোদ্যান নাকি এই জনপদ। অনেক যুগল দৃষ্টিকটুভাবে নিজেদের নিয়ে নিমগ্ন। এক জুটি পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে একে অন্যকে চুষে নিচ্ছে চুম্বনে চুম্বনে। একটু দ্রুতলয়ে হাঁটি। লক্ষ করলাম, এক টলমলে যুবতীর গ্রীবার পাদদেশে ছোপ ছোপ লাল দাগ। এটা কি রোদেপোড়ার চিহ্ন নাকি কোনো প্রেমিকপ্রবরের কামার্ত ভালোবাসার দাগ—ঠিক বোঝা দুষ্কর। দৃষ্টি সরিয়ে দূরে তাকালাম। সাগর কিছুটা অশান্ত হয়ে উঠেছে। মনে হলো, সাগরের ঊর্মিমালার সাথে সুডৌল পর্যটিকাদের দেহের জীবন্ত ঢেউয়ের প্রতিযোগিতা লেগেছে! ভূমধ্যসাগরীয় তরুণীদের ওষ্ঠ আর কপোলের পাশ এমনটাই রঞ্জিত যে মনে হয় পাশের মরূদ্যানে ঝুলে থাকা ডালিমের রস ধার করে এরা রূপের বেসাতি মেলেছে। অপরাহ্ণের আবির এসব তরুণীদের নীল-কালো রোদচশমায় পরিস্ফুট হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে দূরে, আরও দূরে।

সামনে দেখি আর্টিস্টদের অস্থায়ী আখড়া। নিরিবিলি দেখে এক উলুঝুলু শিল্পী পুরোনো দেয়ালে ইজেল সাজিয়েছে। সে রংতুলি নিয়ে বৃহৎ ক্যানভাসে ছবি আঁকবার কসরত করছে। তার হাতে অর্ধপোড়া ধূসর চুরুট। বিষণ্ন মানুষটি ফেনায়িত মদের দীর্ঘ পেয়ালায় অলস অবহেলায় আয়েশ করে চুমুক দিয়ে ভাবনায় বিভোর হয়েছে বুঝি। সে তুলির আঁচড় দিচ্ছে নিপুণ হাতে। কিছু উৎসুক পর্যটক আবার এদিকে ভিড় জমিয়েছে। কেউবা এগিয়ে এসে নিজেদের স্কেচ করবার  জন্য দরদাম শুরু করে দিয়েছে। দেখলাম, এই চিত্রশিল্পীর নিজস্ব ম্যানেজার আছে—যিনি বাকপটুতায় হাঁকিয়ে নিচ্ছেন চড়া দাম।

নাকে লাগল মাছ-মাংস ভাজার ভুর ভুর গন্ধ। আশপাশে কিছু টংঘরও দেখি। মাঝে মাঝে অবশ্য তরমুজের ফালি বা বিয়ারের ক্যান নিয়ে হ্যাংলার মতো দাঁড়িয়ে থাকা অপাঙ্ক্তেয় হকারের কিছুটা উৎপাতও আছে। পথের পাশে শ্বেতপাথরে রঙিন ফরাস বিছিয়ে খুদে খুদে ভাস্কর্যের পসরা সাজিয়েছে এক হাসিখুশি তরুণ। ছেলেটির চেহারায় বাঙালিয়ানার ছাপ দেখে স্বজাত্যবোধ উথলে উঠল। এগিয়ে গিয়ে বাতচিত করে জানতে পারলাম, মাদারীপুরের এক বর্ধিষ্ণু পরিবারের সন্তান সে। অনেক জমি-জিরাত বেচে প্রচুর অর্থকড়ি খরচ করে দালালের মাধ্যমে জাল পাসপোর্ট বানিয়ে তুর্কি হয়ে গ্রিসে এসে হাজির হয়েছে। বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে নাকি খেয়ে-না খেয়ে আর সীমান্তপ্রহরীদের চোখ এড়িয়ে সে প্রথমে এসেছিল ইস্তাম্বুল। শুরুর দিনগুলো নাকি খুব কষ্টে কেটেছে এই সুঠাম যুবকের। কত কষ্টে যে তার দিন কেটেছে! ভাষার সমস্যা, কাজ নেই, এদেশে থাকবার পারমিট নেই। দিনে কুলিকামিনের কাজ করে অটোম্যানদের তৈরি এক পরিত্যাক্ত মসজিদে গিয়ে রাত কাটাত। গত দেড় বছরে কিছুটা গ্রিক ভাষা শিখে খানিকটা সেয়ানা হয়ে পর্যটকের স্বর্গ এই দ্বীপে হাজির হয়েছে ইনকামের ধান্ধায়। বিকেলে মূর্তি-ভাস্কর্য বিক্রি সেরে সে সন্ধ্যা থেকে একটা বারের বাউন্সার হিসেবে কাজ করে।

আমি প্রশ্ন করলাম, এই কাজে ঝক্কি আছে না ?

ছেলেটি খানিকটা গম্ভীর হয়ে দার্শনিকসুলভ প্রজ্ঞায় বলল, জগতের সব কাজেই ঝামেলা আছে, জনাব।

মাথা নেড়ে সম্মতি জানানো ছাড়া আমার উপায় থাকে না।

পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিই—বাউন্সারের কাজ হলো বারের শৃঙ্খলা বজায় রাখা—বিশেষত মাতালদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। সে আবার সবক দেয়, মাতাল সামলানোর তরিকা হচ্ছে ওর সব কথায় হা, হু করে সায় দিয়ে একটা দুটো দিলখুশ প্রশ্ন করে কৌশলে তাকে নিজের কন্ট্রোলে নেয়া।

আমি বললাম, কখনো কি মাতাল নারীর পাল্লায় পড়েছ ?

দুষ্টুমিভরা হাসি দিয়ে সে বলল, অনেক সময় ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয় যখন কোনো সিঙ্গল লেডিকে তার ডেরায় পৌঁছে দেওয়ার এত্তেলা আসে।

এখন বড় বিপণি বিতান থেকে পাইকারি দরে কিনে এনে নিজে বিষণ্নতার মূর্তি হয়ে এই বাঙালি যুবক বেশি দামে বিক্রি করছে সক্রেতিস, প্লেটো, থেমিসদের মূর্তি। সে মাঝে মাঝে মায়ের চিকিৎসার জন্য দেশে টাকা পাঠায়। বেশ কিছু ইউরো সঞ্চয় হয়েছে, আর কিছু জমলেই ইউরোপের মেইনল্যান্ডে পাড়ি জমাবে—সাগরপথে। দালাল নাকি পাকা কথা দিয়েছে। ছেলেটির কাছে এক গৌরী-ক্রেতা হাজির হলে আমি হাত নাড়িয়ে বিদায় হই।

(চলবে)

Leave a Reply

Your identity will not be published.