ধারাবাহিক উপন্যাস : মহররমের মিছিলে

ধারাবাহিক উপন্যাস   :  মহররমের মিছিলে

[‘অলাতচক্র’ একটা নারী গোয়েন্দা এজেন্সি। অলাতচক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পেশায় কাজ করে কিন্তু পাশাপাশি তারা অলাতচক্রের সদস্য। অলাতচক্র গ্রুপের নাম সদস্যদের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে বানান, মানে : অ = অনীলা। লা = লাবণি। ত = তন্বী। চ = চন্দ্রিমা। ক্র = ক্রমেলা।

এই থ্রিলার উপন্যাসটিতে দেখা যায়, পুরোনো ঢাকার মহররমের মিছিলে ‘তাতবির’ করতে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় প্রাণ হারায় তরুণ অপু। পুলিশ প্রাথমিক সুরতহালে একে অতিরিক্ত রক্তরক্ষণজনিত সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে আখ্যা দিলেও, সিআইডি এএসপি লাবণির তীক্ষè নজর এড়ায় নি এর পেছনের অসঙ্গতি। অপুর শরীরে অগণিত ধর্মীয় ক্ষতের ভিড়ে কি লুকিয়ে ছিল কোনো সুনিপুণ ঘাতকের ছদ্মবেশী আঘাত ? মৃত্যু-পূর্ববর্তী সেই রহস্যময় ফোন কল আর পাওনাদারের সাথে বিরোধ কি স্রেফ কাকতালীয়, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নিপুণ ষড়যন্ত্র ? মহররমের ভিড় আর মাতমের আবহে ঢাকা পড়া এক সন্দেহজনক মৃত্যুর জট খুলতে নামে ধীসম্পন্ন গোয়েন্দা লাবণি।]

 

অনীলা, লাবণি, তন্বী, চন্দ্রিমা এবং ক্রমেলা। এদের আদ্যাক্ষর নিয়েই গোয়েন্দা গ্রুপ অলাতচক্র। এ বছর এই গ্রুপের দুজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশের বাইরে। এআই স্পেশালিস্ট তন্বী পোস্টডক করতে আমেরিকার টেক্সাসে গেছে। ক্রমেলা ফটো জার্নালিজমের ওপর একটা ট্রেনিং নিতে জাপানে। অনীলা ঢাকার অফিসে অনেকগুলো ফরেসিক রিপোর্ট নিয়ে ব্যস্ত। চন্দ্রিমা গত সপ্তাহে সিআইডি অফিসে একটা ইন্টারভিউ নিতে এসেছিল। তখন চন্দ্রিমা লাবণিকে বলেছিল এ সপ্তাহে রাঙামাটিতে ওর গ্রামের বাড়ি যাবে। তার মানে চন্দ্রিমা সম্ভবত এখন রাঙামাটিতেই আছে। লাবণি হাসপাতাল থেকে গোধূলি রিসোর্টে এসে চন্দ্রিমাকে ফোন করে বলল, চন্দ্রিমা, তুমি কি রাঙামাটি এসেছ ?

 

না, এখনো রাঙামাটি যাই নি।

তুমি কি তাহলে এখনো ঢাকায় ?

না, না, আমি উখিয়ায় এসেছি। উখিয়া থেকে রাঙ্গামাটি যাব।

উখিয়ায় এসেছ কেন ?

স্যার ছুটি দিয়েছিলেন এই শর্তে যে রাঙামাটি যাওয়ার পথে আমি রোহিঙ্গা শিবিরের ওপর একটা রিপোর্ট লিখব।

কী নিয়ে ?

 রোহিঙ্গা শিবিরে নতুন আবাসন প্রকল্প হচ্ছে। আমি সেটার ওপর একটা প্রতিবেদন লিখছি।

মানে এটা কোনো ক্রাইম রিপোর্ট না ?

ক্রাইম রিপোর্ট না, তবে ওখানে সবকিছুতেই ক্রাইম সিন্ডিকেট ঢুকে যায়।

রাতে কোথায় থাকছ ?

উখিয়ার একটা হোটেলে। ভালো হোটেল, এখানে জাতিসংঘের লোকরাও এসে থাকে।

আমি কিন্তু কক্সবাজার এসেছি।

চন্দ্রিমা অবাক হয়ে বলল, আসলেই ?

হ্যাঁ

দারুণ কোইন্সিডেন্স। আগে বলো নি তো! কেন এসেছ ?

আগে বলি নি কারণ আমাকে আর্জেন্টলি পাঠানো হয়েছে। সাংবাদিক বরুণ মার্মাকে চিনিস ?

ক্রাইম রিপোর্টার বরুণ মার্মা ?

হ্যাঁ।

তার অনেক রিপোর্ট পড়েছি। দু-একবার প্রেসক্লাবে দেখাও হয়েছে। কিন্তু এর বেশি পরিচয় নেই।

আজ সকালে কক্সবাজারে তার ডেডবডি পাওয়া গেছে।

কী বলো আপু ? তিনি কীভাবে মারা গেলেন ?

তিনি আজ খুব ভোরবেলা লাবণী পয়েন্ট বিচে গিয়েছিলেন। বোধহয় মর্নিং ওয়াকে। সূর্যোদয় দেখতে আসা পর্যটকরা বেলাভূমিতে তার মৃতদেহ দেখে পুলিশে খবর দেয়। অ্যাপারেন্টলি কিশোর গ্যাংয়ের একটা গ্রুপ ছিনতাই করার সময় তাকে স্ট্যাব করেছে।

অ্যাপারেন্টলি বলছ কেন ?

আজই তো ঘটল। এখনো ওনার মৃত্যুর কারণ খোঁজা হচ্ছে। এদিকে কিশোর গ্যাং কক্সবাজার সি বিচে খুব অ্যাকটিভ। চুরি, ডাকাতি করে। কিছুদিন আগে এক স্টুডেন্ট লিডারকেও খুন করেছে। এ কারণে এখানকার থানার ওসি ভাবছেন, এটা ওপেন অ্যান্ড শাট কেস, কিশোর গ্যাংই বরুণ মার্মাকে খুন করেছে।

তাহলে তোমাকে কেন পাঠাল ?

বরুণ মার্মার আত্মীয়রা বেশ প্রভাবশালী। দু-একটা জায়গা থেকে চাপ এসেছে মিনিস্ট্রি যেন বিষয়টা সিরিয়াসলি দেখে এবং দ্রুত তদন্ত করে। তিনি তো ঢাকার ক্রাইম রিপোর্ট করেন। এ জন্য আমাকে ঢাকা থেকে পাঠাল।

মানে তোমাকে পাঠিয়েছে কারণ ওরা ভেবেছে তুমিই কেসটা সল্ভ্ করতে পারবে।

সেটাই হবে।

বরুণ মার্মা এখানে কী করছিলেন ?

আমার ধারণা এখানে তিনি কোনো অপরাধের ওপর প্রতিবেদন বানাতেই এসেছিলেন। তিনি একা এসেছিলেন। বেড়াতে এলে ফ্যামিলি নিয়ে আসতেন।

মনে হচ্ছে তুমি সরাসরি কিশোর গ্যাংয়ের ওপর দায় চাপাতে চাচ্ছ না।

না। এজন্যই তোমাকে লাগবে। তুমি নিজেও তো ক্রাইম রিপোর্টার। বরুণ মার্মা কী নিয়ে প্রতিবেদন লিখছিলেন, সেটা তুমি হয়তো খুঁজে বের করতে পারবে।

তুমি বলতে চাচ্ছ অলাতচক্র তাদের কাজ শুরু করে দেবে ?

এগজ্যাক্টলি। তাহলেই কাজটা গতি পাবে।

কক্সবাজার প্রেসক্লাবের দু-একজনের সাথে আমার পরিচয় আছে। আমি খোঁজ লাগাব ?

সে কী আর বলতে ? এক কাজ করো, তোমার হোটেল ছেড়ে আমার হোটেলে উঠে এসো। পারবে ?

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কাজ তো প্রায় গুছিয়ে ফেলেছি। তোমার হোটেলের ঠিকানা মেসেজ করে দাও।

আমি গোধূলি রিসোর্টে উঠেছি। গুগল করলেই ঠিকানা পাবে।

ও, গোধূলি রিসোর্ট! আমি ভালো করে চিনি। চলে আসছি তাহলে।

থ্যাংক ইউ চন্দ্রিমা।

লাবণি ফোন রাখতেই ঢাকা থেকে অনীলা ফোন করল।

কী খবর অনীলা, অপুর ব্যাপারে কোনো আপডেট আছে ?

তোমার ভিক্টিমের ফরেসিক টেস্ট করেছি।

কিছু পেলে ?

না, সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায় নি।

ভিক্টিম যেভাবে মারা গেছে, একজন ইয়াং লোকের জন্য সেটাকে কি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলা যায় ?

অনীলা চিন্তিত কণ্ঠে বলল, তাও বলা যাচ্ছে না। সেটাই মুশকিল। এক কাজ করি, আমি আরেকবার দেখি কিছু মিস করলাম কি না।

হ্যাঁ, তাই দেখো, অনেক সময় জটিল কিছু খুঁজতে গিয়ে সহজটাই চোখ এড়িয়ে যায়।

ঠিক আছে, শোনো, কক্সবাজার থেকে বেশি করে রূপচাঁদা আর লইট্যা শুঁটকি নিয়ে এসো।

আনব, যদি তুমি রান্না করে খাওয়াও।

আমার শুঁটকি রান্না খেলে তুমি পাগল হয়ে যাবে।

আচ্ছা, সে বিচারের ভার আমার ওপর থাক।

অনীলার খাবারের কথা বলায় লাবণির মনে পড়ল সকালে কক্সবাজারে আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত সে কিছুই খায় নি। এ কারণেই পেট চোঁ চোঁ করছে। লাবণি আধঘণ্টার ভেতর গোসল সেরে, কাপড় পাল্টে নিচের রেস্টুরেন্টে চলে এল। রেস্টুরেন্ট প্রায় লোকারণ্য। অনেক হোটেল গরমের মৌসুমে ভাড়ার ফিফটি পার্সেন্ট ডিসকাউন্টে দিচ্ছে। সেই সুযোগ নিতে প্রখর তাপ উপেক্ষা করে লোকজন কক্সবাজার ছুটে এসেছে। লাবণির সামনের টেবিলে এক তরুণ দম্পতি বসে আছে। দুজন খেতে খেতেই খুনসুটি করছে আর হেসে লুটিয়ে পড়ছে। নিশ্চয়ই হানিমুন পিরিয়ড চলছে। ওদের দেখে লাবণির তীব্রর কথা মনে পড়ল। তীব্র অনেকদিন ধরেই বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। লাবণির বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। আরও দেরিতে বিয়ে করলে সন্তান নেয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। একটা কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেই নয়। কিন্তু লাবণির ভয় হয় দুজনেরই যে মাঠে-ময়দানে দৌড়ানো জীবন, বিয়ে করলেও দেখা যাবে সম্পর্কটা লং ডিসটেন্স রিলেশনশিপ হয়ে রয়ে গেছে। তা ছাড়া পুরোনো একটা দুঃখ তো রয়েই গেছে। এ নিয়ে বেশি ভাবতে চায় না লাবণি। ভাবলেই মন বিষণ্ন হয়ে যায়।

সামুদ্রিক মাছের শহরে এসে মাংস খাওয়ার কোনো মানে হয় না। ওয়েটার আসতেই লাবণি ওর পছন্দমতো পদ অর্ডার করল। খাবার আসার ফাঁকে লাবণি পার্স থেকে ছোট একটা নোটবুক বের করে নেক্সট অ্যাকশনগুলো টুকে নিল। আর এক-দুদিনের বেশি লাবণি কক্সবাজার থাকতে চাইছে না। যা করবার কালকের ভেতর করতে হবে। লাবণির মা আয়েশা বেগম হোয়াটসঅ্যাপে অনেকগুলো মেসেজ পাঠিয়েছেন। লাবণি মেসেজের জবাব দিতে দিতে টেবিলে খাবার চলে এল। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, গলদা চিংড়ির ফ্রাই, শুঁটকি মাছের ভর্তা, আর মুগের ডাল। ক্ষুধা পেটে লাবণির এগুলো বেহেশতি খানার মতো লাগছে। একটু দূরে কালো সানগ্লাস পরা একটা লোক চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বারবার ওর দিকে তাকাচ্ছে। লাবণি ব্যাপারটা অনেক আগেই লক্ষ করেছে। এত বছরের গোয়েন্দাগিরির অভ্যাসের কারণে লাবণিও সবুজ পোলো শার্ট পরা ঝুঁটি-চুলের লোকটাকে পাল্টা নজরে রেখেছে।

খাবার শেষে বিল মিটিয়ে লাবণি রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এল। এখান থেকে লাবণী পয়েন্ট পাঁচ-সাত মিনিটের হাঁটা পথ। লাবণি সেদিকে যেতে যেতে একটা দোকানের সামনে থেমে এক জোড়া বিচ স্যান্ডেলের দরদাম করল। ও আড়চোখে ডান পাশে তাকিয়ে দেখল, সবুজ পোলোশার্ট পরা লোকটাও পেছন পেছন চলে এসেছে। লাবণিকে থামতে দেখে সেও থেমে গেছে। লোকটা একটা ছাপড়ি দোকান থেকে সিগারেট কিনে আগুন ধরাচ্ছে। লাবণি এই সুযোগে সেলফি তোলার ভান করে ওই লোকটার বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিল। সন্ধ্যাবেলা গরম কমে এসেছে, আরামপ্রদ মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। লাবণি হাঁটতে হাঁটতে ক্রাইম সিনের কাছে এল। জোয়ারের পানিতে বালুকাবেলা ভিজে গেছে। ভাগ্যিস সব আলামত সকালেই সংগ্রহ করা হয়েছে, দেরিতে এলে হাপিত্যেশ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকত না। সমুদ্রসৈকতে আগের মতো ভিড় নেই। এদিকে ওদিকে চা-কফির অস্থায়ী দোকানগুলো ঘিরে ছোট ছোট বিক্ষিপ্ত জটলা লেগে আছে। সমুদ্রের হাওয়া গায়ে মেখে ভাবনার জটলা খোলার জন্যই লাবণি এখানে এসেছে, কিন্তু পেছন পেছন আসা লোকটার কারণে ও সতর্ক হয়ে গেছে। সন্দিগ্ধ মন নিয়ে ও অন্য কিছু ভাবতে পারছে না। এখানকার দোকানের চা-কফি খাওয়ার কোনো ইচ্ছেই লাবণির ছিল না, তবু ও একটা দোকানে গিয়ে কফি অর্ডার করল। বুদ্ধিটা কাজে দিয়েছে। লোকটাও উদাস উদাস ভাব করে দোকানে এসে চা দিতে বলল। লাবণি বোঝার চেষ্টা করছে লোকটা কি ওকে সুন্দরী মেয়ে ভেবে অনুসরণ করেছে নাকি লোকটা জানে লাবণি আসলে কে।

লাবণি কফি খেতে খেতে আড়চোখে লোকটাকে লক্ষ করছে। গাট্টাগোট্টা দশাসই গড়ন। মুখে পুরু গোঁফ। গায়ের রং ঘন শ্যামলা। লোকটা লাবণির দিকে তাকাতেই মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে। লোকটার বাঁ চোখ যে পাথরের সেটা লাবণির সুতীক্ষè নজর এড়াল না। লোকটা কিছু একটা আঁচ করেছে, চা অর্ধেক খেয়েই দাম মিটিয়ে উল্টো দিকে হাঁটা দিয়েছে। লাবণিও সামান্য বিরতি দিয়ে লোকটার পিছু ধরে হাঁটা শুরু করল। লোকটা মোবাইলে কারও সাথে কথা বলতে বলতে মেইন রোডে উঠে গেছে। লাবণিও দ্রুত হেঁটে মূল সড়কে চলে এল। একটা সাদা মাইক্রোবাসের স্লাইডিং ডোর খুলতেই লোকটা সুরুত করে ভেতরে ঢুকে গেল। গাড়িটা দ্রুত বেগে পশ্চিম দিকে ছুটছে।

 

(চলবে)

Leave a Reply

Your identity will not be published.