ধারাবাহিক উপন্যাস : মহররমের মিছিলে

ধারাবাহিক উপন্যাস :  মহররমের মিছিলে

[‘অলাতচক্র’ একটা নারী গোয়েন্দা এজেন্সি। অলাতচক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পেশায় কাজ করে কিন্তু পাশাপাশি তারা অলাতচক্রের সদস্য। অলাতচক্র গ্রুপের নাম সদস্যদের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে বানান, মানে : অ = অনীলা। লা = লাবণি। ত = তন্বী। চ = চন্দ্রিমা। ক্র = ক্রমেলা। 
এই থ্রিলার উপন্যাসটিতে দেখা যায়, পুরোনো ঢাকার মহররমের মিছিলে ‘তাতবির’ করতে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় প্রাণ হারায় তরুণ অপু। পুলিশ প্রাথমিক সুরতহালে একে অতিরিক্ত রক্তরক্ষণজনিত সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে আখ্যা দিলেও, সিআইডি এএসপি লাবণির তীক্ষè নজর এড়ায় নি এর পেছনের অসঙ্গতি। অপুর শরীরে অগণিত ধর্মীয় ক্ষতের ভিড়ে কি লুকিয়ে ছিল কোনো সুনিপুণ ঘাতকের ছদ্মবেশী আঘাত ? মৃত্যু-পূর্ববর্তী সেই রহস্যময় ফোন কল আর পাওনাদারের সাথে বিরোধ কি স্রেফ কাকতালীয়, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নিপুণ ষড়যন্ত্র ? মহররমের ভিড় আর মাতমের আবহে ঢাকা পড়া এক সন্দেহজনক মৃত্যুর জট খুলতে নামে ধীসম্পন্ন গোয়েন্দা লাবণি।]

৭
চন্দ্রিমা আর লাবণি উখিয়া রোহিঙ্গা শিবিরের সিআইসি তাহমিনা খানের সাথে দেখা করতে এসেছে। সাদা রং করা দোতলা পাকা ভবনের নিচতলার শেষ মাথায় তাহমিনা খানের অফিস। নানা পদের লোকজন নানা ধান্দায় তাহমিনা খানের অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। চন্দ্রিমা আর লাবণি তাহমিনা খানের অফিসরুমে ঢুকতেই উনি সতর্ক দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকালেন। লাবণি কোনো ভণিতা না করে বলল, আমি সিআইডির এএসপি লাবণি। একটা সম্ভাব্য অপরাধ তদন্তে ঢাকা থেকে এসেছি। আর চন্দ্রিমাকে আপনি হয়তো আগে থেকে চেনেন।
হ্যাঁ, চন্দ্রিমা আমার সাথে একবার দেখা করেছিলেন। আপনারা দুজন পরিচিত ?
জি।
সিআইডি ঢাকা থেকে আপনাকে এখানে পাঠিয়েছে মানে কোনো সিরিয়াস ক্রাইম নিয়ে আপনি ইনভেস্টিগেশন করছেন ?
জি, কক্সবাজারে একজন ক্রাইম রিপোর্টার কাল খুন হয়েছেন। তদন্ত করতে গিয়ে মনে হচ্ছে, এই ক্যাম্পের কোনো ঘটনার সাথে খুনের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
এই ক্যাম্প মানে কিন্তু একটা বিশাল জটিল ব্যাপার।
কী কারণে ?
ব্রাজিলের রিও শহরের ফাভেলার কথা শুনেছেন ?
হ্যাঁ, শুনেছি। রিওর পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা ঘনবসতি। ইনফর্মাল সেটেলমেন্ট।
জি, ঠিক বলেছেন। ফাভেলাগুলো শহরের ভেতর আরেকটা ছোট শহর। সরকারের আইনকানুন সেখানে মোটামুটি অচল। মাদক ব্যবসা আর ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে ওখানে খুনখারাবি লেগেই থাকে। মাঝেমাঝে ঝটিকা অভিযান চালানো ছাড়া পুলিশ তেমন কিছুই করতে পারে না। আমি একটা ট্রেনিংয়ে রিওতে গিয়েছিলাম। একটা ফাভেলা ঘুরে দেখার সুযোগও হয়েছিল। কোনো কোনো জায়গায় ছবি তোলাও নিষেধ, ছবি তুলতে গেলে খুন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। এই রোহিঙ্গা শিবিরও অনেকটা ফাভেলার মতো।
আপনার কথায় বুঝতে পারছি, ফোর্স থাকা সত্ত্বেও জায়গাটা বিপজ্জনক। আরেকটু স্পেসিফিকভাবে বলতে পারবেন এই বিপদ কারা তৈরি করছে ?
এই ক্যাম্পে দশ লক্ষ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। মানে উখিয়ার জনসংখ্যা ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম শহরের জনসংখ্যার সমান। কিন্তু উখিয়া তো বার্মিংহামের মতো সাজানোগোছানো কোনো শহর না। আপনি যেমন বললেন, এটা একটা ইনফরমাল সেটেলমেন্ট। একটু ঘুরে দেখলেই বুঝবেন, পুরো ক্যাম্পটা হলো ছোট ছোট গলিওয়ালা ঘিঞ্জি বস্তি। দিনের বেলা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কারণে তেমন কোনো সমস্যা হয় না কিন্তু তবুও দেখবেন কোথাও কোথাও থমথমে অবস্থা। আর রাত হওয়ার সাথে সাথেই কিছু কিছু এলাকা অপরাধের স্বর্গরাজ্য হয়ে যায়।
চন্দ্রিমা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, কী ভয়ংকর! তাহলে পুলিশ কী করে ?
এপিবিএন রাতেও থাকে। কিন্তু ঘিঞ্জি বাড়িঘর আর দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশের কারণে রাতের অন্ধকারে ক্যাম্পের অলিগলিতে টহল দেওয়া পুলিশের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়েই সন্ত্রাসীরা আধিপত্য বিস্তারের জন্য রাতের বেলা খুনোখুনি করে। অফ দ্য রেকর্ড, সরকার এদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ, অনেক সময় ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের ক্রসফায়ারেও সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হয়।
চন্দ্রিমা বলল, আমি যতদূর জানি, ইয়াবার চোরাচালান নিয়েই যত গন্ডগোল। তাই না ?
একসময় তাই ছিল। মিয়ানমার থেকে চোরাই পথে এখন ক্রিস্টাল মেথও আসে। তারপর সারা দেশে ছড়িয়ে যায়। হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। অবভিয়াসলি এত বড় ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন দলের সংঘাত লেগেই থাকে।
লাবণি বলল, আপনি নিশ্চয়ই জানেন এসব অপরাধে কারা স্পেসিফিকলি জড়িত ?
আমাদের ধারণা আমরা জানি। তবে ক্যাম্পের ভেতরে একটা না, অনেকগুলো সশস্ত্র দল আছে।
চন্দ্রিমা বলল, আমি শুনেছি মিয়ানমার বর্ডারের কাছে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র দল আছে, জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে। আপনি বলছেন ক্যাম্পের ভেতরেও ওরকম সশস্ত্র দল আছে ?
হ্যাঁ, ক্যাম্পের ভেতরেও আছে। এত বড় ক্যাম্পের কন্ট্রোল ওরা চাইবে না ? সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী সশস্ত্র দল হলো, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি। আমরা একে বলি আরসা। রোহিঙ্গারা বলে, আল-ইয়াকিন। ইয়াবা আর ক্রিস্টাল মেথ চোরাচালানের মূল রুটগুলো এদের দখলে। তবে ইদানীং এদের আরেকটা দল চ্যালেঞ্জ করছে।
সেটা কোন দল ?
রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন, মানে আরএসও। এই দুই দলের সংঘাতেই খুনোখুনিগুলো হয়।
লাবণি বলল, তার মানে নারী পাচার আর নারী ব্যবসার সিন্ডিকেটগুলো এই দুটো দল চালায় ?
প্রথমে এটাই মনে হবে। কিন্তু আসলে না। নারী ব্যবসার সিন্ডিকেট চালায় দুটো গ্রুপ, মুন্না বাহিনী আর হাকিম ডাকাতের দল। আরসা কিংবা আরএসওর ড্রাগ স্মাগলিং-এর একটা এজেন্ডা আছে, ওরা আরাকান স্বাধীন করবার জন্য ফান্ড বানাচ্ছে। কিন্তু মুন্না আর হাকিম বাহিনীর কোনো নীতিফিতি নেই। এরা স্রেফ দস্যু।
তার মানে কক্সবাজার শহরে এই মুন্না-হাকিম চক্রই রোহিঙ্গা মেয়েদের দেহব্যবসায় বাধ্য করে ?
হ্যাঁ, তবে শুধু কক্সবাজার শহরে না, এই ক্যাম্পের ভেতরেও এসব সমান তালে চলে। কক্সবাজারের অনেক প্রভাবশালী লোকজনও এই চক্রের অংশ।
হ্যাঁ, সেটাই স্বাভাবিক। আমি যতদূর জানি এই ক্যাম্পে অনেক লোক এইডস রোগে আক্রান্ত।
অনেক বলতে কাগজেকলমে হাজার দুয়েক নারী-পুরুষের এইডস আছে।
আর কাগজকলমের বাইরে ?
সেটা বলা মুশকিল। রোহিঙ্গারা খুবই রক্ষণশীল। কারও এইচআইভি আছে জানাজানি হলে ওরা সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে যায়। এ কারণে কেউ সহজে এইডসের পরীক্ষা করাতে চায় না। এতে এইডস আরও ছড়িয়ে পড়ছে। আমার ধারণা, সত্যিকার এইডস রোগীর সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি।
চন্দ্রিমা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, কী ভয়াবহ অবস্থা! এইডস নিশ্চয় প্রস্টিটিউশনের কারণেই ছড়িয়ে পড়ছে ?
সেটা একটা বড় কারণ। তবে হু আমাকে বলেছে আরও কারণ আছে।
লাবণি জানতে চাইল, আর কারণ কী হতে পারে ?
ক্রিস্টাল মেথ নেওয়ার সময় একই সিরিঞ্জ অনেকে ব্যবহার করছে। এতেও এইডস ছড়িয়ে পড়ছে। তাছাড়া মিয়ানমার থেকে আসার আগেই অনেকে এইডসে আক্রান্ত ছিল। এখানে এসে এদের রোগ শনাক্ত হয়েছে।
এখন আমার তদন্তের বিষয়টা আরেকটু বিশদ করে বলি। কাল লাবণি বিচে যে সাংবাদিক খুন হয়েছেন, তার নাম বরুণ মার্মা। লোকাল পুলিশ বলছে কিশোর গ্যাং ওনাকে মেরেছে। কিন্তু আমার সন্দেহ ওনার মৃত্যুর সাথে ক্যাম্পের লোকদের কোনো একটা যোগসাজশ আছে।
ভদ্রলোক একবার আমার অফিসে এসেছিলেন।
উনি এইডস নিয়ে রিপোর্ট বানাচ্ছিলেন। এ কারণে আমিও ভেবেছি উনি ক্যাম্পে আসবেন।
উনি এইডসের কথা বলেন নি। বলেছিলেন এখানকার ওভারঅল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন লিখছেন। তবে এইডস সেটার অংশ হতেই পারে।
আপনার কাছে উনি কেন, বোধহয় পারমিশনের জন্য এসেছিলেন ?
হ্যাঁ। এখানে অনেক এনজিও স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করছে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এদের কো-অর্ডিনেট করে। উনি এই এনজিওগুলোর কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করার অনুমতি চাইতে এসেছিলেন। আমাদের অনুমতি নেওয়াটাই এটাই প্রটোকল।
আপনি অনুমতি দিয়েছিলেন ?
হ্যাঁ। এখানে তো লুকানোর কিছু নেই। তবে এনজিওগুলো চাইলে সাক্ষাৎকার নাও দিতে পারে। সেটা তাদের ব্যাপার। ওনাকে বলেছি ক্যাম্পে সাবধানে চলাফেরা করতে। এরপর আর আমার সাথে ভদ্রলোকের কথা হয় নি।
এনজিওগুলোর লিস্ট পাওয়া যাবে ? আমি একটু কথা বলে দেখতাম।
এখন তো আমার আরেকটা মিটিং আছে। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস দিন, আমি পাঠিয়ে দেব। আপনারা এখানে অবাধে তদন্ত করতে পারবেন। চাইলে আমাদের সিকিউরিটি থাকবে আপনাদের সাথে।
তাহমিনা খানকে ধন্যবাদ জানিয়ে ওরা বাইরে বেরিয়ে এল। দূরে টিলার মাথা ছুঁয়ে শেষ বিকেলের সূর্যটা রক্তিম দীপ্তি ছড়াচ্ছে। ওরা গাড়ির কাছে আসতেই লাবণি সতর্ক হয়ে গেল। একটু দূরেই রাস্তার ওপারে একটা এনফিল্ড মোটরসাইকেলের ভটভট আওয়াজ আসছে। দুজন বসে আছে মোটরসাইকেলে। হেলমেট পরা থাকলেও এত বছরের গোয়েন্দাগিরির অভিজ্ঞতায় লাবণি ভালোই চিনতে পারছে সামনের লোকটা কে। ব্যাপারটা খুব একটা সুবিধার মনে হচ্ছে না।

(চলবে)
 

Leave a Reply

Your identity will not be published.