সার্বিয়া: শুভ্র শহরের দেশে (পঞ্চম পর্ব)

সার্বিয়া: শুভ্র শহরের দেশে (পঞ্চম পর্ব)

[কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা বা ঘোরাঘুরি— এসব ক্ষেত্রে ভ্রমণপিপাসু বেশির ভাগ মানুষের ঝোঁক পশ্চিম ইউরোপের দিকে। অথচ পাহাড়-নদী-প্রকৃতির সৌন্দর্যে বিখ্যাত পূর্ব ইউরোপও। যেখানে রয়েছে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আর ইতিহাস-ঐতিহ্যের বাস্তবধর্মী পাঠ। এমনই এক দেশ সার্বিয়া। ভ্রমণের বহুরৈখিক পথে লেখকের কাছে নতুন উপজীব্য হয়ে ওঠে সার্বিয়ান এক তরুণী। ঠিক প্রেম নয়, প্রেমের চেয়ে কম কিছুও নয়। পার্থিব দৃশ্যপটের সঙ্গে উঠে এসেছে রোমান্সের হৃদয় ছোঁয়া-না ছোঁয়ার গল্পও। যার পুরো বর্ণনা থাকছে ইমদাদ হকের এই ভ্রমণকাহিনিতে। আজ পড়ুন পঞ্চম পর্ব।] 

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

চতুর্থ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

 

দর্শকের চোখে ধুলো দিচ্ছে কাঠের পোশাক

‘এই পোশাকটা জোভাঙ্কা ব্রোজের মতোই। তোমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক বুঝি? কী নাম এটার?’

‘তোমার ভুল হচ্ছে মি. হক। আদতে দেখতে মনে হলেও এগুলো কাঠের তৈরি। এই প্রদর্শনীতে যেগুলো দেখছ, শিল্পীরা বানিয়েছেন। তন্তু বা সুতা দিয়ে নয়, কাঠ মসৃণ করে।’

আমাদের গাইড দ্রেদারমিচ চোভানিচের উত্তর শুনে থমকে দাঁড়াই। চোখ কচলে আবারও দেখতে থাকি। আরটিএস সেন্টারের নিচের ফ্লোরে আমরা। এক পাশে জোভাঙ্কা ব্রোজের পোশাকের প্রদর্শনী, অন্য পাশে শিল্পীর আঁকা ছবির প্রদর্শনী। ম্যাডামরা যখন ব্রোজের পোশাকেই মত্ত, সে সময়টা গল্প করছিলাম সাংবাদিক সিমোনোভিচের সঙ্গে। এই গ্রুপে এসে যোগ দেন দ্রেদারমিচ চোভানিচ। তিনিই সন্ধান দেন, ফ্লোরের অন্যপাশে কারুশিল্পীদের প্রদর্শনী হচ্ছে। চাইলে আমরা দেখে আসতে পারি।

নিখুঁত শিল্পকর্ম। শিল্পীদের এমন আশ্চর্য শিল্পকর্ম। দর্শকরা অভিভূত হওয়ার পর যে খানিকটা বিরক্ত হন নি-এমনটাও বলা যায় না! কেননা, আসল পোশাক মনে করে গিয়ে ধরেছেন, দেখা গেল ধারণা ভুল। এমনকি প্রদর্শনী হলে সুন্দর ভাস্কর্যের গায়েও চাপিয়ে দেওয়া সেই পোশাক!

হাতের মোবাইল সচল হয়ে উঠে, স্মৃতির ঝুড়িতে যোগ হবে নতুন কিছু উপকরণ। সামনে এগোই, বিস্ময় জাগে। নতুন দেশের সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি জানতে চাওয়ার আগ্রহ পুরোনো অভ্যাস। এই প্রদর্শনী দেখে মন ভরে যায়। ঘুরে ঘুরে দেখি।

জুতা, অন্তর্বাস, জ্যাকেট দেখতে হুবহু আসল মনে হলেও সেগুলি বেশ ভারী, পরারও উপায় নেই। আবার, নাইভ পেইন্টিং বলতে বোঝায় সহজ, সরল, প্রায় শিশুসুলভ সব ছবি। পেশাদারি চিত্রকলার সঙ্গে যার সম্পর্ক, যেমন ধরা শক্ত, তেমন বোঝা শক্ত। অথচ সেই চেষ্টাই করেছেন সার্বিয়ান চিত্রশিল্পীরা। শিল্পকলার এত জ্ঞান আমার নেই, তবে আগ্রহ আছে। আলাপ চালিয়ে নেওয়ার মতো কৌশলে চলি। গল্পগুজবে তাল মেলানোর মতো প্রাথমিক জ্ঞান আছে। আলোচনার টেবিল বা চায়ের দোকানের আড্ডায় সেগুলো উগরে দিই।

বাইরে তখন সার্বিয়ান বৃষ্টি। দর্শনার্থী হাতে গোনা চার-পাঁচ জন। কেউ আসছেন, যাচ্ছেন- গড়ে এই চার-পাঁচের বেশি হচ্ছে না কখনোই। আমার সমতল কপালে ভাঁজ দেখা দেয়, ব্রোজের পোশাক বলি আর শ্রেমসকা কামেনিকা, জুবিংকা জোভানোভিচ, দুসান ওতাসেভিকদের বিখ্যাত শিল্পকর্মই বলি, সবগুলোর বর্ণনা দেওয়া সার্বিয়ান ভাষায়।

‘ন্যাম সম্মেলনে আগতদের বড়ো অংশ এই প্রদর্শনী দেখতে আসবে।’

খানিকটা বিরক্তি চেপেই বলি চোভানিচকে।

‘হ্যাঁ।’

‘পৃথিবীর কতজন সার্বিয়ান ভাষায় কথা বলে? তুমি জানো এখন পৃথিবীর জনসংখ্যা কত-৭৮৮ কোটি। সেখানে সার্বিয়ানদের সংখ্যা ১ কোটিই নয়! আমি নিজে সার্বিয়ান ভাষা বুঝি না, অন্য দেশের লোকজন কীভাবে এগুলোর অর্থ উদ্ধার করবে? তুমি জানো, ভাষার জন্য আমরা প্রাণ দিয়েছি? মাতৃভাষার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ অন্য যে-কারও চেয়ে বেশি। সার্বিয়ার সঙ্গে ইংরেজিটা একটু যোগ করে দিলে অসুবিধা কোথায়?’

মুখ কাঁচুমাচু চোভানিচের, ‘প্রথম দিকে এই প্রদর্শনীর কোনো পরিকল্পনা ছিল না। শেষের দিকে এসে তড়িঘড়ি করে আয়োজন করা হয়েছে। ইংরেজি সাবটাইটেল দিলে ভালো হতো, সময় পাই নি। একই ঘটনা জোভাঙ্কা ব্রুজের প্রদর্শনীতেও, সব সার্বিয়ান ভাষায়।’ 

প্রদর্শনীতেই মন দিই আবার। ছবির কিছু মূল ছবির অনুলিপি, যা সার্বিয়ান শিল্পীদের অঙ্কন করা। এর মধ্যে রয়েছে সালভাদর মুন্ডি। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা ২০টি অক্ষত ছবির এটি একটি। ধারণা করা হয়, ১৫০০ সালে এ ছবিটি আঁকা হয়। ১৯৫৮ সালে ছবিটিকে অনুলিপি ভেবে নিলামে মাত্র ৬০ মার্কিন ডলারে বিক্রি করা হয়। যিশুখ্রিষ্টের এ ছবিটি ২০১৭ সালে ১০ কোটি মার্কিন ডলারে বিক্রি হবে ধারণা করা হয়েছিল। এক ক্রেতা ৪৫ কোটি ডলার দিয়ে কেনেন এটি। নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত মার্টেন ও ওপইয়েন-এর ১৬৩৪ সালের অনুষ্ঠিত বিয়ের ছবির মতো আরেকটা ছবিও স্থান পেয়েছে এখানে।

আধাঘণ্টার জায়গায় আরটিএস সেন্টারে আমাদের সময় যায় দুই ঘণ্টা। পরের গন্তব্যের জন্য বের হই।

(চলবে…) 

 

Leave a Reply

Your identity will not be published.