শম্পা কী চায়? (পর্ব ১৫)

শম্পা কী চায়? (পর্ব ১৫)

[থ্রিলার উপন্যাস। এই উপন্যাসের প্রতি পদে রহস্য ও রোমাঞ্চের হাতছানি। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার জাহিদ আহমেদ। ঢাকার রেডিসন হোটেলে শম্পা নামের একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেখানের একটি রুমে শম্পার সঙ্গে যাওয়ার পর কী ঘটে, তা জাহিদের মনে নেই। এরপর শম্পা জাহিদের ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজির ছাত্রী সেজে তার পিছু নেয়, অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিওর ভয় দেখিয়ে  ব্ল্যাকমেইলিং করতে থাকে...। এক সময় শম্পা খুন হয়। কে খুন করল শম্পাকে? জাহিদ আহমেদ নাকি অন্য কেউ? নাকি অন্য রহস্য জড়িয়ে আছে এখানে? আজ পড়ুন ১৫তম পর্ব।]

প্রথম পর্ব  দ্বিতীয় পর্ব তৃতীয় পর্ব চতুর্থ পর্ব পঞ্চম পর্ব 

ষষ্ঠ পর্ব সপ্তম পর্ব অষ্টম পর্ব নবম পর্ব দশম পর্ব  

পর্ব ১১ পর্ব ১২ পর্ব ১৩ পর্ব ১৪

প্রফেসর জাহিদ চাকুরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হলে কী, বিভিন্ন কলেজ এই সুযোগে তাকে বিনে পয়সায় জুম লেকচার দেওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। আজ তিনি বেছে নিয়েছেন লালমাটিয়া মহিলা কলেজ। ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের কল্লোলিত যুবতীদের দিকে ক্যামেরায় তাকিয়ে প্রফেসর জাহিদ বললেন,

কখনো হৃদয় পুরোপুরি

দিতে নেই,

কারণ সব মিষ্টভাষী খেলারাম

খেলা ফুরোলেই

হৃদয়ের ব্যাকুলতা ভুলে যায়।

O never give the heart outright,

For they, for all smooth lips can say,

Have given their hearts up to the play.

এটা বলেছেন কবি ইয়েটস। এখন ধরো এই যে বিল্লীর মতো আদুরে বিলকিস আমার লেকচার শুনছে, সে ইয়েটসের সাবধান বাণী মানল না। বিলকিস তার ব্যাকুল হৃদয়টা আমাকে পুরোপুরি দিয়ে দিল। কিন্তু দুদিন পর আমি বিলকিসকে ভুলে মেঘলাকে নিয়ে মেতে উঠলাম। গভীর বেদনায় ঝড়ের রাতে খোলা জানালার কাচের মতো ঝনঝন ঝনঝন করে ভেঙে গেল বিলকিসের মন। তখন তুমি কী করবে বলো বিলকিস?

বিলকিস প্রফেসরের প্রশ্রয় পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে বলল, কী করব স্যার? সুইসাইড? ঘুমের বড়ি খাব?

আরে নাহ, এভাবে বলে না বিলকিস। আমার কষ্ট হয়। তখন তোমাকে পড়তে হবে এ যুগের কাহলিল জিবরানের কবিতা।

সে কে স্যার?

এ যুগের কাহলিল জিবরান কে? কানাডিয়ান কবি রূপী কাউর। তোমরা কি রূপী কাউরের নাম শুনেছ?

জুমে সবাই বোকা বোকা দৃষ্টিতে স্যারের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রফেসর বললেন, ইংরেজি সাহিত্য পড়তে হলে রিসেন্ট ট্রেন্ডগুলো জানা জরুরি। এই যেমন ইউটিউবে একটা কার্টুন এসেছে না, পানির নিচে ডলফিনটা তো জঙলের মতো। সেটা তোমরা জানো?

সবাই একসঙ্গে মহা উৎসাহে হ্যাঁ বলল। প্রফেসর কথা চালিয়ে গেলেন,

শুধু পানির নিচের ডলফিন জানলে তো হবে না, ইংরেজি কবিতাও জানতে হবে। এই রূপী কাউর মেয়েটা হৃদয়ের ডান অলিন্দ বাম অলিন্দে কলম চুবিয়ে কবিতা লেখে। রুপী লিখেছে,

What is stronger

Than the human heart

Which shatters over and over

And still lives?

হৃদয়ের চেয়ে শক্তিমান

আর কী হতে?

 সে তো বারবার,

ভাঙে, গুঁড়ো হয়

তবু তো টিকে যায়।

আজ প্রফেসরের মনটা একটু ফুরফুরে। অন্তত এটুকু বোঝা গেছে যে শম্পা খুন হয় নি। শম্পার বাসার পেছনের ডাস্টবিনে পাওয়া মৃতদেহটা শম্পার না। পুরো ঘটনা যে কারও সাজানো নাটক সেটা এখন বেশ আঁচ করা যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নাটকের মূল হোতা কে? শম্পা নাকি প্রোভিসি? কিম্বা অন্য কেউ? প্রফেসরের জুম লেকচার শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রোকসানা দু কাপ চা হাতে ঘরে ঢুকে বলল, জাহিদ একটা কথা বলতে পারি? আগেই বলব ভেবেছিলাম কিন্তু শম্পার মার্ডার নিয়ে তুমি ডিসটার্বড্ ছিলে দেখে বলি নি।

কী কথা?

তুমি এত সুন্দর সুন্দর কবিতা শোনাও সবাইকে, ইংরেজি সাহিত্যে এই যে তোমার সহজাত অগাধ পাণ্ডিত্য, আমি এটা অনেক রেস্পেক্ট করি। কিন্তু এতদিন তোমার সঙ্গে ঘর করে আমার কী মনে হয়েছে জানো?

কী?

ইউ আর অ্যা ড্যামেজড সোল।

রোকসানার কথায় প্রফেসর সামান্য আহত হয়ে বললেন, ড্যামেজড সোল?

হ্যাঁ। তোমার আত্মায় একটা গভীর ক্ষত আছে, কিসের ক্ষত সেটা আমিও জানি না। মনে হয় তুমি যুদ্ধ শেষ না করেই কোনো একটা রণক্ষেত্রে থেকে পালিয়ে এসেছে, সম্ভবত সেই কষ্ট তোমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

তোমার বিয়ের আগে মিন করছ?

হুম, তুমি তো ওই সময়ের কোনো কথাই আমাকে বলো না। নিশ্চয় তোমার কোনো ক্ষত আছে, এ জন্য তুমি এত অশান্ত আর অস্থির। কোনো রকমে লাফিয়ে লাফিয়ে যতটা কম মাটি ছোঁয়া যায় সেভাবে তুমি জীবনের মুহূর্তগুলো অতিক্রম করছো। কিন্তু আমি বলব, এভাবে এড়িয়ে গেলে চলবে না, তোমাকে কষ্টের শেকড়ে ফিরে যেতে হবে। যা তুমি অসমাপ্ত ফেলে এসেছ সেটার যবনিকা টানতে হবে। এই কথাগুলো তোমাকে বলার জন্য আমি অনেক দিন ধরে প্র্যাক্টিস করেছি। এজন্যই এখন একটানে বকরবকর করে বলতে পারলাম।

হুম, খুব গুরুত্বপূর্ণ অ্যাডভাইস দিলে রুকুমণি। একটু দাঁড়াও আমি টয়লেট থেকে আসছি।

রোকসানা না বুঝেই প্রফেসরের মনের একটা ঝাঁপি খুলে দিয়েছে। প্রফেসর জাহিদ বাথরুমে গিয়ে সিঙ্কের ট্যাপ ছেড়ে চোখমুখে জলের ঝাপটা দিতে লাগলেন। কুলেস্ট প্রফেসর হিসেবে নিজের কান্না তিনি নিজেও দেখতে চান না। চোখমুখ ধুয়ে প্রফেসর আয়নার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, রোকসানা ঠিকই বলেছে। আমি তো অনেক আগেই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। আমার আর কখনোই জীবনের কাছে ফেরা হবে না। জীবন আমাকে আহত করেছে, আমিও জীবনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে যাব। আই অ্যাম অ্যা লস্ট সোল।

প্রফেসর ঘরে ফিরতেই রোকসানা বলল, তুমি তো মেয়েগুলোকে দেখলাম খুব রুপী কাউরের কবিতা শোনালে। ওর একটা কবিতা আমিও তোমাকে শোনাই? তোমার কাছে থেকেই শেখা।

শিওর রুকিমণি।

Isn’t it time to

Nurture intimacy

and love

With the person

I lie in bed each night?

আমি তো চেষ্টা করছি রুকিমণি। অনেক সময় নিজের ওপর কন্ট্রোল থাকে না। তুমি তো জানোই আমি এমন।

ওরা কথা বলতে বলতেই লাবণির ফোন এল। লাবণি বলল, প্রফেসর সাহেব, আপনার জন্য দুটো সুখবর আছে।

জি, বলুন।

আমরা এখন এক শ’ পারসেন্ট কনফার্ম এই মেয়েটা শম্পা না।

কীভাবে শিওর হলেন?

বেশি দিন অলংকার না পরলে কানের দুলের ফুটো, নাকফুলের ফুটো ওগুলো অনেক সময় নিজেই বন্ধ হয়ে যায়। তাই ব্যাপারে একটু সন্দেহ ছিল। কিন্তু আমরা ফরেনসিক টেস্ট করে দেখেছি এই মেয়ের নাকে কখনো ফুটোই করা হয় নি। তার মানে আপনাকে এখুনি থানায় হাজিরা দিতে হচ্ছে না।

কনফার্ম করার জন্য ধন্যবাদ ডিটেকটিভ। আসলেই এত টেনশন কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারছি না। দ্বিতীয় সুখবরটি জানতে পারি?

জি, অবশ্যই। দ্বিতীয় সুখবরটি হলো, আপনাদের কাহিনি জটিল মোড় নেয়ায় ডিবি অফিস আমাকে এই কেইস নিয়ে অফিসিয়ালি কাজ করতে বলেছে। তার মানে অফিসের সব রিসোর্স আমি ব্যবহার করতে পারব। কাল অথবা পরশু সময় করে আপনি আমার অফিসে চলে আসুন প্লিজ।

প্রফেসর খুশি হয়ে বললেন, শিওর, শিওর।

ইন্সপেক্টর লাবণি ফোন রেখে ভাবল, শম্পা সোহানি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বুদ্ধিমতী মেয়ে। সে মৃত দেহের চেহারাতেই শুধু মিল করে নি, মৃতের হাতে নিজের আংটি পরিয়েছে, মৃত মেয়েটার রক্ত অ্যাপার্টমেন্টে ছিটিয়েছে, মেয়েটার চুলের আলামত প্রফেসরের শরীরে রেখেছে। মিলিকে মর্গে না আনলে প্রফেসর নিশ্চিতভাবে ফেঁসে যেতেন।

কিন্তু প্রফেসরের ফাঁসি হলে শম্পার কী লাভ? একটা মৃতদেহ শম্পার অ্যাপার্টমেন্টের পেছনে ফেলতে যে লজিস্টিক সাপোর্ট লাগে শম্পা সেটা কোথায় পেল? হয় শম্পা নিজেই খুব ক্ষমতাবান অথবা তার পেছনে আছে সংঘবদ্ধ এবং শক্তিশালী অপরাধী চক্র।

কিন্তু বুদ্ধিমান লোকেরা কখনো কখনো বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়, অতিরিক্ত থ্রিলের নেশায় বিপদের ঝুঁকি নিয়ে বসে। একটা মৃতদেহকে নিজের নামে চালাতে গিয়ে শম্পা বেশ কিছু ভুল করেছে। নাকফুলের ফুটোর কথা সে নিজেই ভুলে গিয়েছিল, হয়তো বেশ কদিন নাকফুল পরে নি বলেই ভুলটা করেছে। এ রকম ভুল তাড়াহুড়ো করলেও হয়।

শম্পার কিসের তাড়া ছিল? প্রফেসরকে ফাঁসাতে চাইলে তো ভিডিও দিয়ে ফাঁসানো যেত, শম্পা সেটা করে নি কেন? তার মানে শম্পার নীতি এবং ধর্মবোধ যথেষ্ট প্রবল। সম্ভবত সে কোনো অশ্লীল ভিডিও বানায় নি। সে আরও জটিলভাবে প্রফেসরকে ফাঁসাতে চেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃকলহের কারণে যদি কেউ প্রফেসরের ক্ষতি করতে চায় তাহলে অশ্লীল ভিডিওই সবচেয়ে ভালো অস্ত্র ছিল। প্রফেসর মেয়েদের ব্যাপারে যে রকম ইজি গোয়িং, অনেক মেয়েকে দিয়েই কাজটা করানো যেত। এইসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে শম্পার পেছনে না ঘুরে আগে মৃতদেহকে শনাক্ত করতে হবে, মানে উল্টো দিক দিয়ে এগোতে হবে।

এই অদ্ভুত কেইস নিয়ে ভাবতে ভাবতেই অলাতচক্রের কম্পিউটার জিনিয়াস তন্বীর ফোন এল। তন্বীর আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স সফটওয়্যারের নাম খোদেজা বেগম। খোদেজা বেগম মৃত মেয়েটিকে শনাক্ত করবার জন্য ন্যাশনাল আইডি থেকে শুরু করে সরকারের গোপন সব ডেটাবেজ সার্চ করেছে। তন্বী বলল, গেস হোয়াট?

কী? পেয়েছ মেয়েটির পরিচয়?

ময়মনসিংহের কাছে দুর্গাপুর বলে একটা এলাকা আছে।

তো?

ওখানকার ভোটার আইডিতে মেয়েটিকে পাওয়া গেছে। আমি আপনাকে ডিটেলস পাঠাচ্ছি।

দারুণ কাজ, তন্বী। আমি এখন বের করার চেষ্টা করব মেয়েটি কীভাবে মারা গেল আর তার ডেড বডি ঢাকায় কীভাবে এল।

আরেকটা কথা।

কী?

মেয়েটার ইমেজ সার্চ করবার সময় আরেকটা মেয়ের ছবি, পরিচয় চলে এসেছে। এই মেয়েটা নাকফুল পরে আছে।

লাবণি উত্তেজিত হয়ে বলল, শম্পা?

নাম অন্য দেখাচ্ছে।

সেটাই স্বাভাবিক। শম্পা সোহানি যে ফেক নেইম, সেটা আমি আগেই বুঝেছি। ইন ফ্যাক্ট্ শম্পা সোহানি এই ডেডবডি নিয়ে চালাকি করতে গিয়ে কারণে নিজের কবর নিজেই খুঁড়ল। ঠিক আছে তন্বী তুমি শম্পা সোহানিকে লোকেট করো আর আমি ওই আনলাকি মেয়েটির ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছি।

লাবণি ফোন রাখতে না রাখতেই আবার কার ফোন এল। লাবণি ফোন ধরতে ধরতে ভাবল, আজ মনে হচ্ছে টেলিফোনের যন্ত্রণায় পাগল হয়ে যেতে হবে। ওপাশ থেকে প্রোভিসি মাহতাব হাবিব বললেন, ডিটেক্টিভ, আপনি সেদিন জিজ্ঞেস করলেন না জাহিদের সাথে আমার আগে থেকেই রেষারেষি ছিল কিনা?

জি।

সেই কথা ভাবতে গিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে পড়ল। আপনার কাজে লাগতেও পারে।

কী ঘটনা?

বাইশ তেইশ বছর আগের ঘটনা। তখন আমরা দুজনেই মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছি। আচ্ছা ডিটেকটিভ, আপনি কি বাসায় আসতে পারবেন, ফোনে সব কথা বলতে চাচ্ছি না। লম্বা গল্প।

 (চলবে…)

Leave a Reply

Your identity will not be published.